Sunday, 30 September 2018

মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসন ব্যবস্থা এবং অশোকের সংযোজন- উভয়ের সংযোজনে মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল| মৌর্য শাসন ব্যবস্থার মূল কাঠামোটি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য রচনা করলেও পরবর্তীতে সম্রাট অশোক এই কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে এতে কিছু সংযোজন ঘটান|

মৌর্য শাসন ব্যবস্থার সম্পর্কে জানার জন্য মূল উপাদান ছিল কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা, সম্রাট অশোকের লিপি সমূহ, শকরাজ রুদ্রদামনের জুনাগর শিলালিপি, বিদেশি ঐতিহাসিক স্টাবো, প্লিনি, জাস্টিন প্রমুখের রচনা সমূহ|

সুবিশাল মৌর্য সাম্রাজ্য কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল, যেগুলিকে জেলা বা জনপদ নামে পরিচিত ছিল| প্রশাসনিক বিভাগে সর্বনিম্ন স্তরে ছিল গ্রাম| মৌর্য শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রাজা| রাষ্ট্রের প্রধান শাসক, প্রধান আইন প্রণেতা, প্রধান বিচারক এবং প্রধান সেনাপতি হিসেবে তিনি অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন|

মৌর্য রাজারা এক "প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী" ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল| বংশানুক্রমিক রাষ্ট্রের উপর প্রতিষ্ঠিত মৌর্য শাসন ব্যবস্থায় রাজাগণ দৈবসত্বে বিশ্বাসী না হলেও নিজেদের দেবনাম প্রিয় বা দেবতার প্রিয় বলে অভিহিত করতো|

মৌর্য-সাম্রাজ্যের-শাসন-ব্যবস্থা

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায়, রাজার পরে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রধান ছিলেন সচিবগণ| মেগাস্থিনিস তাদের "উপদেষ্টা ও রাজস্ব সংগ্রাহক" বলে অভিহিত করেছেন| দক্ষ সচিবরা মন্ত্রী পদে নিযুক্ত হতেন, যারা শাসন নীতি ও পররাষ্ট্র বিষয়ে পরামর্শ দিতেন| ড. হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী এদের অশোকের আমলে মহাপাত্রদের সঙ্গে তুলনা করেছেন| মন্ত্রিপরিষদ নামে একটি গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, যারা মূলত রাজাকে পরামর্শের জন্য নিযুক্ত হতেন, এই পরিষদের পরামর্শ গ্রহণ করা বা না করা রাজার ইচ্ছাধীন ছিল|


সময় সামরিক রচনা থেকে মৌর্য শাসন ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়| অমাত্য নামে কর্মচারীদের উপর রাজস্ব, অর্থ, বিচার ও প্রশাসন প্রভৃতি বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হতো| বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তারা ওই পদ পেতেন এবং অপরিক্ষিতরা নিচু পদে নিযুক্ত হতেন|

সরকারি কাজে নানা বিভাগ বা Department ছিল| এসব বিভাগের প্রধানকে বলা হতো অধ্যক্ষ| খনি, গোশালা ও অশ্বশালা প্রভৃতি তদারকির দায়িত্ব ছিল অধ্যক্ষদের উপর| অর্থশাস্ত্রে 32 জন অধ্যক্ষ এবং তাদের কার্যাবলীর বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়| অর্থশাস্ত্রে সমাহর্তা এবং সন্নিধাতা নামে দুই শ্রেণীর কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়| সমাহর্তা ছিলেন রাজ্যের রাজস্ব বিভাগের প্রধান এবং সন্নিধাতা ছিলেন রাজার কোষাধক্ষ্য| চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে মৌর্য সাম্রাজ্য চারটি সুবিশাল প্রদেশে বিভক্ত ছিল- প্রাচ্য, উত্তরাপথ, অবন্তীদক্ষিণাপথ|

অশোকের সময় আরেকটি সংযোজন ঘটানো হয়েছিল- কলিঙ্গ| তাদের রাজধানীগুলি ছিল যথাক্রমে- পাটলিপুত্র, উজ্জয়িনীতক্ষশীলা, তোসালি এবং সুবর্ণগিরি| প্রদেশেগুলির শাসনভার রাজকুমারদের উপর ন্যাস্ত থাকতো| প্রদেশেগুলির উপর কেন্দ্রীয়ভাবে রাজকীয় নিয়ন্ত্রণ বলবৎ থাকতো|

মৌর্য শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তরে ছিল গ্রাম| গ্রামের শাসক ছিলেন গ্রামিক| অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, গ্রামের উপর গোক নামক কর্মচারী ছিলেন| জেলার শাসনকর্তা ছিলেন সমাহর্তা| মেগাস্থিনিসের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, গ্রাম এবং নগরগুলি স্বায়ত্ত শাসন ভোগ করত|

30 জন সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিষদের মাধ্যমে নগর শাসন পরিচালিত পরিচালিত হতো| এই পরিষদগুলি শিল্প ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি আগুন্তকদের তত্ত্বাবধান, বাণিজ্য ও শুল্ক পরিচালনা, জন্ম-মৃত্যু হিসাব রক্ষা ইত্যাদি দ্বায়িত্ব পালন করত| ড. এ. এল. ব্যাসাম তার "The wonder that was india" গ্রন্থে মেগাস্থিনিসের বিবরণকে মাপকাঠি ধরে মৌর্য রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পুলিশি রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন|


মেগাস্থিনিসের বিবরণ বিবরণ থেকে মৌর্য সেনা ব্যবস্থার কথা জানা যায়| পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তিবাহিনী , রথারোহী এবং নৌবাহিনীর অস্তিত্বের কথা জানা যায়| অর্থশাস্ত্র থেকে মৌর্য যুগের গুপ্তচর ব্যবস্থার কথা জানা যায়| মেগাস্থিনিসের মত, 30 জন সদস্য নিয়ে গঠিত একটি পরিষদের ওপর সামরিক বিভাগের দায়িত্ব অর্পিত ছিল|

অর্থশাস্ত্রে "ধর্মস্থ" এবং "প্রদেষ্টা" নামে দুই শ্রেণীর বিচারকের উল্লেখ আছে| বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ রাজাই ছিলেন সর্বোচ্চ আদালত| নগরে পৌর ব্যবহারিক এবং গ্রামে গ্রামীকগণ বিচারকার্য পরিচালনা করতেন| বিদেশীদের জন্য পৃথক আদালত ছিল| দেওয়ানী বিচারালয়ে ছিল ধর্মস্থ এবং কন্টকশোধন ছিল ফৌজদারি বিচারের কেন্দ্র| এই যুগে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা কার্যকর ছিল|

সম্রাট অশোক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে কর্তব্যবোধকে যোগ করেছিল| প্রজা কল্যাণের উদ্দেশ্যে তিনি রাজুক, প্রাদেশিক, ধম্মমহাপাত্র, যুত ইত্যাদি নতুন কর্মচারী নিয়োগ করেন| রাজুকদের হাতে প্রজাকল্যাণের দায়িত্ব অর্পিত ছিল| ধম্মমহাপাত্রদের হাতে দায়িত্ব ছিল প্রজাদের মনে ধর্মমত জাগ্রত করা| অশোকের পঞ্চম শিলালিপি থেকে তাদের সম্পর্কে জানা যায়|

অশোকের দ্বাদশ শিলালিপি থেকে প্রজাভূমিকদের কথা জানা যায়, যারা দেশের সর্বত্র জনহিতকর কাজ করত| বিচারের ক্ষেত্রে অশোক দন্ড সমতাব্যবহার সমতা নীতির প্রবর্তন করেন করেন| এইভাবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে অশোক ধর্ম নৈতিকতা, রাজকীয় কর্তব্যবোধের আদর্শ যুক্ত করেন|

মৌর্য শাসন ব্যবস্থায় প্রাচীন ভারতে প্রথম এক উন্নত শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল| ড. ভিনসেন্ট স্মিথ এর মতে, মৌর্য সম্রাট ছিলেন অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী| কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে বলেছেন যে, প্রজাদের কাছে রাজার কোন দায় বদ্ধতা ছিল না| এই আমলে কঠোর দন্ড নীতির মাধ্যমে প্রজাদের মধ্যে শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হতো|

গুপ্তচরদের ব্যাপক ব্যবহার এবং সুনিয়ন্ত্রিত গুপ্তচর ব্যবস্থা জনগণের ব্যক্তিগত জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল| মন্ত্রিপরিষদ থাকলেও তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা বা না করা সবই ছিল রাজার ইচ্ছাধীন| এ সকল কারণে মৌর্য শাসন ব্যবস্থাকে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র বললেও অত্যুক্তি হবে না|

মৌর্য শাসন ব্যবস্থায় এক কেন্দ্রিকতা ঝোঁক থাকলেও রাজা স্বৈরাচারিতার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধি নিষেধ ছিল| রাজাকে পুরাণ প্রকৃতি অনুযায়ী দেশ শাসন করতে হতো| মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ সব সময় রাজা উপেক্ষা করতে পারতেন না| রাজা সেনাবাহিনী প্রধান হলেও যুদ্ধ পরিচালনা, সন্ধি স্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেনাপতিদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন| গুপ্তচর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশী শক্তির সম্পর্কে অবহিত থাকা যে কোন নায়কেরই কর্তব্য|

অশোক তার শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রজাকল্যাণ , পিতৃত্ববোধ ইত্যাদি যুক্ত করে মৌর্য শাসন ব্যবস্থাকে এক উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন| তার লক্ষ্যই ছিল প্রজাদের ইহলৌকিক ও পরলৌকিক উন্নত সাধন| মৌর্য আমলে গ্রাম ও শহরগুলিতে স্বশাসনের কথা ভিন্ন ঐতিহাসিক রচনা থেকে পাওয়া যায়| তাই মৌর্য শাসন ব্যবস্থাকে Benevolent despotism  হিসেবে অভিহিত করাই শ্রেয়|

তথ্যসূত্র

  1. সুনীল চট্টোপাধ্যায়, "প্রাচীন ভারতের ইতিহাস"
  2. Ashok. K Banker, "Ashoka: Lion of Maurya".
  3. Wytze Keuning, "Ashoka the Great"
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
           ....................................................




Thank you so much for reading the full post. Hope you like this post. If you have any questions about this post, then please let us know via the comments below and definitely share the post for help others know.

Related Posts

0 Comments: