বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম উত্থানের পিছনে পার্থিব ও আদর্শগত পটভূমি

ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার লিখেছেন, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মধ্য-গাঙ্গেয় উপত্যকায় শহরের বিস্তার, কারিগরদের সংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্রুত প্রসার- এই সমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যোগাযোগ ছিল আরেকটি বিষয়ের সঙ্গে- তা হল ধর্ম ও দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা| 

মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকা হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলনের পীঠস্থান| পূর্ব ভারতে মগধ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাকে কেন্দ্র করে বৈদিক ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণ ধর্ম ও সাংস্কৃতিক গোঁড়ামি এবং আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপক বিরোধী হয় যে নতুন ধর্মমতগুলি আত্মপ্রকাশ করে, তার মধ্যে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম ছিল অগ্রগণ্য|

বৌদ্ধ-ধর্ম-ও-জৈন-ধর্ম-উত্থানের-পিছনে-পার্থিব-ও-আদর্শগত-পটভূমি
বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ
বৌদ্ধ-ধর্ম-ও-জৈন-ধর্ম-উত্থানের-পিছনে-পার্থিব-ও-আদর্শগত-পটভূমি
জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর 


প্রতিবাদী ধর্মান্দোলনের উদ্ভবের কোন বিচ্ছিন্নকারী ঘটনা ছিল না| এই উদ্ভবের একটি মতাদর্শগত প্রেক্ষাপটই ছিল| আগেকার যুগের তপস্বী ও ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসীদের দল নতুন নতুন চিন্তা ও দার্শনিক ভাবনার একটি ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিলেন| নিমিত্তবাদ থেকে জড়বাদ সবই ছিল এই ভাবনার পর্যায়ভুক্ত| 

অজীব নামে একদল দার্শনিক ছিলেন| যাদের বিশ্বাস ছিল, আগে থেকেই পৃথিবীর সমস্ত কিছু স্থির এবং কিছুতেই তার পরিবর্তন সম্ভব নয়| এছাড়া অনেক নিরীশ্বরবাদী গোষ্ঠীও ছিলেন| এদের মধ্যে চার্বাকরা সম্পূর্ণ জড়বাদ প্রচার করতেন| জড়বাদীরা পুরোহিতদের অর্থহীন অনুষ্ঠানগুলির উপর পুরোহিতের জীবিকা নির্ভর করত| বলা যায় ব্রাহ্মণ ধর্মের পুরোহিতন্ত্র, যাগযজ্ঞ, আচার-অনুষ্ঠান সর্বোস্বতার বিরোধিতার এই মতাদর্শগত প্রেক্ষাপটই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মতো প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন এর উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করেছিল|

বৌদ্ধ-ধর্ম-ও-জৈন-ধর্ম-উত্থানের-পিছনে-পার্থিব-ও-আদর্শগত-পটভূমি


প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের উন্মেষ ঘটেছিল প্রধানত অব্রাহ্মণদের মধ্যে| পরবর্তী বৈদিক যুগের সমাজ ছিল বৈষম্যপূর্ণ| এসময় সমাজ চারটি বর্ণের বিভক্ত হয়ে পড়েছিল- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র| বর্ণশ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে ব্রাহ্মণদের স্থান ছিল সবার উপরে| সমাজ ও রাষ্ট্রে তারা নানা রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতো| তাদের রাজস্ব দিতে হতো না, এমনকি অপরাধের জন্য তাদের শাস্তিও হতো না| ব্রাহ্মণদের এই আধিপত্যের উপর তিনটি বর্ণকে ক্ষুব্ধ করেছিল|

ক্ষত্রিয়রা ছিল যোদ্ধা ও শাসক শ্রেণীর মানুষ| যুদ্ধে অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা, রাজস্ব আদায় ও প্রশাসন পরিচালনার দায়-দায়িত্ব থাকলেও সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের অধিকার ও মর্যাদা ছিল ব্রাহ্মণদের তুলনায় কম| অন্যদিকে সম্পদ বৃদ্ধি, রাষ্ট্রে আর্থ-সামাজিক দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও বৈদিক সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈশ্য ও শূদ্রদের কোন রকম মর্যাদা দেননি| তবে শূদ্রদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়| স্বাভাবিক ভাবেই এই বর্ণ বিভক্ত সমাজে শান্তি ছিল না বললেই চলে|

সমাজ ও ধর্মে ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া আধিপত্য রাজনৈতিক দিক থেকে ক্ষত্রিয়দের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি| এই কারণে পরবর্তী বৈদিক যুগ থেকেই সমাজে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়| এখানে উল্লেখনীয় যে, প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ, আর জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর উভয় ছিলেন ক্ষত্রিয়|


তবে ব্রাহ্মণদের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্ষত্রিয়দের এরূপ বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের উদ্ভবের প্রধান কারণ ছিল না|

ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা মনে করেন, "প্রতিবাদী ধর্মগুলির আবির্ভাবের প্রকৃত কারণ ছিল, উত্তর-পশ্চিম ভারতের একটি নতুন ধরনের কৃষি অর্থনীতির উদ্ভব"| এই নতুন কৃষি অর্থনীতির বিকাশের মূলে ছিল লৌহ নির্মিত কৃষি সরঞ্জামের ব্যবহার ও গো সম্পদ| খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতক থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে বারানসি, রাজঘাট, গোয়া জেলার সোনপুর, বৈশালীর নিকট রঘুসই প্রভৃতি স্থানে উৎখননের ফলে প্রচুর লোহার সরঞ্জাম আবিষ্কৃত হয়েছে| লোহার তৈরি কুঠারের সাহায্যে যেমন বন-জঙ্গল পরিষ্কার করা সম্ভব, তেমনি গভীরভাবে জমি কর্ষণ করার জন্য প্রয়োজন হয় লাঙলের ফলার| আবার লাঙল টানার জন্য দরকার হয় প্রচুর শক্তি|

বৌদ্ধ-ধর্ম-ও-জৈন-ধর্ম-উত্থানের-পিছনে-পার্থিব-ও-আদর্শগত-পটভূমি
কুঠার

বৌদ্ধ-ধর্ম-ও-জৈন-ধর্ম-উত্থানের-পিছনে-পার্থিব-ও-আদর্শগত-পটভূমি
লাঙল


কিন্তু পুজা পার্বনে যথেষ্ট বলিদানের বৈদিক রীতি স্বাভাবিকভাবেই নতুন কৃষি অর্থনীতিতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল| বৈদিক অনবরত বলিদানের ফলে পশুশক্তির ক্রমশ কমে এসেছিল| বলা বাহুল্য একটি অশ্বমেধ যজ্ঞেই 600 ষাঁড় হত্যা করা হতো| সুতরাং নতুন এই কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতিকেই স্থায়ী করার জন্য নির্বিচারে পশু হত্যা বন্ধ করা আবশ্যক ছিল|

কৃষিকাজের আয়তন ও উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে সমাজে উদ্বৃত্ত খাদ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং এই উদ্বৃত্ত নগরে উদ্ভব ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তারের সহায়ক হয়|প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক উভয় উপাদান থেকে প্রমাণিত যে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকায় নগরের আবির্ভাব ঘটেছিল| ঐতিহাসিকরা যাকে "দ্বি-নগরায়ন" বলে চিহ্নিত করেছেন| মহাপরিনিব্বান সুক্তের 6 টি গুরুত্বপূর্ণ নগরের উল্লেখ পাওয়া যায়| এগুলি হল চম্পা, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, সাকেত, কৌশ্বাম্বী, কাশী| এই নগর গুলিতে অসংখ্য কারিগর ও ব্যবসায়ীরা বাস করত| এরাই সর্বপ্রথম মুদ্রা ব্যবহার শুরু করেছিল|


মুদ্রা ব্যবহারের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি হয় এবং কারিগর ও ব্যবসায়ীরা যথেষ্ট ধনবান হয়ে উঠে| কিন্তু ব্রাহ্মণ প্রভাবাধীন বৈদিক সমাজে ধনবান বৈশ্যদের কোন সামাজিক মর্যাদা দেননি| স্বভাবতই তারা এমন এক ধর্মের অন্বেষণে ছিল, যে ধর্ম তাদের সামাজিক মর্যাদা দিতে সক্ষম| বলাবাহুল্য এই ধর্ম তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে ছিল| এই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বর্ণভেদ প্রথার কোন স্থান ছিল না| একারণে বৈশ্যরা এই দুই প্রবল ধর্মমতের প্রবল সমর্থকে পরিণত হয়|

এছাড়া ব্রাহ্মধর্মে শাস্ত্রে টাকা ধার দেওয়া, সুদ গ্রহণ করা ও সমুদ্র যাত্রা নিন্দনীয় ছিল ও পাপ বলে চিহ্নিত হতো| বোধায়ন সমুদ্রযাত্রাকে পাপ বলে নিন্দা করেছেন, অথচ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এগুলি অপরিহার্য ছিল| বহু মহাজনের সুদের কারবার করতো এবং এতাই ছিল অনেকের জীবিকা| কিন্তু ব্রাহ্মণ সমাজে এগুলি ঘৃণার চোখে দেখতো এবং সমাজের চোখে এসব ব্যক্তিরা অপরাধী বলে বিবেচিত হতেন| স্বভাবতই বৈশ্যরা ব্রাহ্মণ ধর্মের বিরোধী হয়ে উঠেন এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মকে সমর্থন করে তারা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হয়|

রোমিলা থাপার বলেছেন, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম প্রচলিত সংস্কার বিরোধী এই ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল মূলত শহরাঞ্চলের নিম্ন শ্রেণীর মানুষকে কেন্দ্র করেই| বৈশ্যরা ধনী হওয়া সত্ত্বেও সমাজে তেমন সম্মান পেতেন না| আর শূদ্ররাতো অত্যাচারিত শ্রেণী ছিলেনই| জাতিভেদকে সরাসরি আক্রমণ না করলে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম বর্ণাশ্রমের বিরোধী ছিল এবং এগুলিকে বর্ণভেদহীন আন্দোলনও বলা চলে| এই ভাবে সমাজের নিম্ন বর্ণের মানুষ নিজের বর্ণ ত্যাগ করে এক নতুন বর্ণহীন গোষ্ঠীতে যোগ দেবার সুযোগ পেল|

অধ্যাপক রোমিলা থাপার বলেছেন, "যদিও ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের হাতেই ছিল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আর্থিক উন্নতি তখন তুঙ্গে| ব্রাহ্মণ্যবাদের পাল্টা জবাব হিসেবে তারা বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম বেছে নিয়েছিলেন|



তথ্যসূত্র

  1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় "প্রাচীন ভারতের ইতিহাস" (প্রথম খন্ড)
  2. Poonam Dalal Dahiya, "Ancient and Medieval India".
  3. Upinder Singh, "A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. মধ্যপন্থা (আরো পড়ুন)
  2. জৈন ধর্মের বৈশিষ্ট্য (আরো পড়ুন)
  3. প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য  (আরো পড়ুন)

Author of this post

Elora Saha
About- বর্তমানে তিনি একজন গৃহবধূ
Read more- (click here)

                        .................................


Ask questions :

:

--Click here:--

Mock Test

Visit our Mock Test Episodes - (click here)

Share this post with your friends

Need help..? send message privately.
Previous
Next Post »