কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের ফলে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে এর প্রভাব

কৃষি  বাণিজ্যিকীকরণের ফলে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক ভেদাভেদ জেগে উঠে| মূলধন সংগ্রহ এবং বাজারমুখী উৎপাদনকে ধনতান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার অগ্রাহ্য লক্ষণ বলে মনে করা হয়| যে কোনভাবেই হোক না কেন ভারতীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্যোগ কৃষকদের মধ্য থেকে প্রায় আসতো না| ফলে কৃষি কাজের ক্ষেত্রে তাদের লাভও হতো না| পূর্বে ভারতে নীল চাষের ক্ষেত্রে কোম্পানির সরকারি উদ্যোগ নেয়|

1829 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জমির কেনার অধিকার না থাকায় এই বাগিচা মালিকরা স্থানীয় কৃষকদেরকে প্রথমে রাজি করানোর চেষ্টা করেন, পরে বল প্রয়োগ করে যাতে কৃষককে অগ্রিম অর্থ দিয়ে তাদেরকে দিয়ে জমিতে নীল চাষ করানো যাই| নীল চাষ শোষণ ও পীড়নমূলক হয়ে উঠে,  এর পরিণামে ঘটে নীল বিদ্রোহ|

একটা কথ্যরূপ ধারণা আছে যে, অন্যান্য বাণিজ্যিক শস্যের ক্ষেত্রে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে চাষ করতো, কারণ ছিল খাজনার উচ্চ হার| খাজনা দেওয়ার ছিল অপরিহার্য এবং বাধ্যতামূলক, এছাড়া থাকতো ঋণশোধের দায়ী| অর্থাৎ কৃষকেরা লাভের দিকে তাকিয়ে কোন একটি বিশেষ শস্য উৎপাদনে সিদ্ধান্ত নেওয়া পছন্দ করত| তবে ধনী কৃষকেরা পণ্য শস্য চাষের ঝুঁকে নিত|

কৃষি-বাণিজ্যিকীকরণ-এর-প্রভাব
কৃষক
কৃষি-বাণিজ্যিকীকরণ-এর-প্রভাব
কৃষি জমি


এরপর 1870 দশকে কৃষি সম্পর্কিত দাঙ্গা বেঁধে যায়| পূর্ব ভারতের কৃষকরা নিজেদের জীবিকার সংস্থানটুকু সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে পাট চাষের ক্ষেত্রে হাত লাগাই| এর ফলে পূর্ব ভারতের পাট চাষ উন্নত হয়| সুতরাং পাট চাষের কাজে নিযুক্ত হওয়ার মধ্যে কৃষকদের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল| সুগত বসু বলেছিলেন যে, ''1906 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1913 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পাটের বাজার তেজী থাকলেও পাটের উৎপাদকরা সেই তেজী বাজারের সুখ লাভ করতে পারিনি বললেই চলে''|

ভারতীয় কৃষক সমাজের উপরে কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাব সম্পর্কে তীর্থঙ্কর রায়ের মন্তব্য উল্লেখ করা যায়| তার বক্তব্য হল, "কোন সামগ্রিক উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে তার মূল্য বেড়েছে| এই উদ্বৃত্তের অধিকাংশটাই হাতিয়ে নিয়েছে| ধনী আরও ধনী থাকতে পারে, তবে কিন্তু তার অর্থ এই নয় গরিবরা আরও গরিব হয়েছিল, কারণ মোট আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল| তবে কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অধিকাংশ কৃষকেরই লাভ হয়নি| তাই দ্রুত এমন একটি সিদ্ধান্তে আসলে ভুল হবে যে, উৎপাদনে উত্তোলন ঘটেছিল| ধনতন্ত্র অবস্থা থেকে ধনতন্ত্র, যার লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতাশালী গ্রামীণ ধনীক শ্রেণীর উত্থান এবং কৃষক সম্প্রদায়কে সর্বহারা শ্রেণীতে পরিণত করা"|

1930 এর দশকে পাট চাষের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, এরপরে 1943 খ্রিস্টাব্দে বাংলায় নেমে আসে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ| কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে দুর্ভিক্ষের কোন সম্পর্ক ছিল কিনা, সেকথা বলা কঠিন| যদিও কিছু কিছু জমিতে বাণিজ্যিক পণ্য শস্য উৎপাদনের ফলে ভালো মানের ফলনশীল জমি থেকে খাদ্যশস্য উৎপাদন পিছু হটে যায়, অর্থাৎ ভালো মানের জমিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে পণ্য শস্য উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হয়| পরিণামে শস্যের ফলন এর উপর প্রভাব পড়ে|

উপনিবেশিক শাসন যখন শেষ হয়ে আসে, তখনও কর্ষিত জমির শতকরা 80 ভাগ অংশে খাদ্য শস্য উৎপাদন হতো| কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন যে, পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশীয় বাজার গুলিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রগতি ঘটানো হয়| এর ফলে খাদ্য শস্যের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায় এবং উপনিবেশিক ভারতে দুর্ভিক্ষে তীব্রতা ও সম্ভাবনা নিয়ন্ত্রণে আসে|

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে গ্রামীণ জীবনে এক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়| মৃদুলা মুখার্জির মতে, "এই বাণিজ্যিকীকরণ কৃষি ক্ষেত্রে এক আধা সামন্ততান্ত্রিক এবং আধা ঔপনিবেশিক উৎপাদন ব্যবস্থার সৃষ্টি করেছিল"|

অমিত ভাদুড়ি বাংলায় কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বলতে গিয়ে বুঝেছিলেন যে, "এই ব্যবস্থা জমিতে উপস্বত্বের সৃষ্টি করেছিল"| সুনীল সেন দেখিয়ে লিখেছেন যে, "কৃষি ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার হতে থাকলেও সনাতন রীতিতে বিশ্বাসী কৃষকগণ তা গ্রহণ করতে চাইনি"| সুগত বস মনে করেন, "এর ফলে কৃষি ক্ষেত্রে একটা স্থবিরতা তীব্রতা আছে"|

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ হেতু ব্রিটিশ বাগিচা মালিক, ব্যবসায়ী এবং উৎপাদনকারীরা বিপুল পরিমাণ মুনাফা লাভের সুযোগ পায়| কৃষির বাণিজ্যকরণের ফলে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আংশিকভাবে উপকৃত হয়| এছাড়া ঋণদাতাগন এই ব্যবস্থার ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ দানের বিনিময়ে লাভের সুযোগ পাই| এছাড়া ঋণগ্রহণকারীরা কৃষকেরা ঋণশোধের ব্যর্থ হলে তাদের জমিগুলি ঋণদাতারা দখল করে নিতো|

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অধিকাংশ ভারতবাসী কষ্টকর অবস্থার মধ্যে পড়েছিল| এই ব্যবস্থার ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছিল| কেননা তার জায়গা দখল করেছিল বাণিজ্যিক শস্য উৎপাদন| একটা পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় 1993-94 সাল থেকে 1945-46 খ্রিস্টাব্দে বাণিজ্যিক শস্য উৎপাদনের পরিমাণ 85 শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন 7 শতাংশ হ্রাস পেয়েছি| এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল এবং ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল|

আমরা বলতে পারি যে, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের একটা মিশ্র প্রভাব ছিল| যখন ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের সহায়ক হয়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক শস্য, তখন ভারতে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল| কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ ভারতবর্ষে এক নতুন দিক উন্মোচিত করেছিল| এরফলে ভারতের ধনীক শ্রেণী এবং ব্রিটিশ শিল্পগুলি উপকৃত হয়েছিল| কিন্তু ভারতীয় কৃষকদের জীবন আন্তর্জাতিক বাজারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল| তবে বাণিজ্যিকীকরণ সামাজিক বিনিময় এবং ভারতীয় অর্থনীতিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার সম্ভাবনা সূচিত করেছিল| ভারতীয় কৃষির সাথে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল|


তথ্যসূত্র

  1. সুমিত সরকার, "আধুনিক ভারত"
  2. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, "পলাশি থেকে পার্টিশন"
  3. Sonali Bansal, "Modern Indian History".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
              ......................................................

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো

ইউটিউব চ্যানেল

ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইব করে আমাদের সঙ্গে থাকুন- Click Here

মক টেস্ট

ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে- Click Here

ফেসবুকের মাধ্যমে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

Click Here

আমাদের সঙ্গে ফেসবুক গ্রুপে থাকুন

Click Here

সাহায্যের প্রয়োজন ?

প্রশ্ন করুন- Click Here

ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

Delivered by FeedBurner