সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব এবং এটি কিভাবে বাংলার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল

1765 খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের সুযোগে সরাসরি রাজস্ব আদায়ের অধিকার গ্রহণ করেন, এরফলে কোম্পানির অনিয়ন্ত্রিত শোষণ শুরু করে| নবাবের অক্ষমতা, ইংরেজ কর্মচারীদের দায়িত্বহীনতা বাংলাকে এক অভাবনীয় সংকটের সম্মুখীন করে দেয়|

নবাবের সাধ্য ছিল না যে, কোম্পানি ও তার কর্মচারীদের লোভ থেকে বাংলাকে মুক্ত করা| মীরজাফরের দ্বিতীয়বার নবাব পদ প্রাপ্তির সময় থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিপুল পরিমাণ রাজস্বের উপর কোম্পানির কর্মচারীদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়|

সম্পদের-বহির্গমন-তত্ত্ব



বাংলার সম্পদ নিষ্কাশনের কোম্পানির(Drain of wealth) স্বার্থ ছিল ক্রমবর্ধমান| ইংরেজরা ভারতীয় শিল্প দ্রব্য ক্রয়ের নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়, উপরন্তু কোম্পানির রাজস্ব বাবদ যে অর্থ বাংলা থেকে সংগ্রহ করতো, সেই টাকায় তারা দেশীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতে শুরু করে এবং লাভজনক মূল্যে ইউরোপীয় অন্যান্য বাজারে বিক্রি করতো| 

1766-68 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এইভাবে 57 লক্ষ পাউন্ড বাংলা থেকে ইংল্যান্ডের হাতে চলে গিয়েছিল| এই অর্থনৈতিক শোষণ এবং প্রশাসনের দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার ফলে 1770 খ্রিস্টাব্দে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ(ছিয়াত্তরের মন্বন্তর) অনিবার্য হয়ে উঠে|

পলাশী যুদ্ধের পরবর্তী 100 বছর ধরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা থেকে প্রচুর সম্পদ ইংল্যান্ডে চালান করতে থাকে, যাকে বলা হয় সম্পদের বহির্গমন| কম্পানি 1765 খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পরে বাংলার রাজস্ব আদায়ের সূত্রে যে অর্থ লাভ করে, তা এদেশের কাঁচামাল কেনার জন্য খরচ করে|

সম্পদের-বহির্গমন-তত্ত্ব
ব্রিটিশ পতাকা


ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলা থেকে সম্পদ নিষ্কাশনের পরিমাণ দিনের পর দিন বাড়িয়ে দিতে থাকে| গ্যান্টের তথ্য অনুসারে বছরে 1 কোটি টাকা লগ্নি হিসাবে বিদেশে চলে যেত|

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চীনের বাণিজ্য চালানোর জন্য এদেশ থেকে সোনা, রুপা রপ্তানি করতে থাকে এবং বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ করে দেয়| এই দেশের সোনা, রুপা সরবরাহের হ্রাস পায় এবং মুদ্রা সংকট দেখা দেয়| অথচ ভারতের সম্পদ থেকে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব গড়ে উঠে| রমেশচন্দ্র দত্ত, দাদাভাই নওরোজি সম্পদের বহির্গমনের ফলে বাংলার আর্থিক চিত্রের করুণ দশাটি তুলে ধরেছেন|

ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই যে বিপুল অর্থ-সম্পদ ভারত থেকে দেশের বাইরে চলে যেত, তাকে ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য এডমন্ড বার্ক "Drain of wealth" বলে বর্ণনা করেন|

সিংহাসনে বসেই মীরজাফর ইংরেজদেরকে দেড় কোটি টাকা প্রদান করে| ক্লাইভ 27 লক্ষ টাকা ব্যক্তিগতভাবে পুরস্কার লাভ করে| ইংরেজ নৌ বাহিনী ও সেনা বাহিনীর জন্য মীরজাফর অতিরিক্ত 25 লক্ষ টাকা প্রদান করে| আবার মীরকাসিম কোম্পানিকে দক্ষিণ ভারতের যুদ্ধের জন্য 5 লক্ষ টাকা দেন|

সম্পদের-বহির্গমন-তত্ত্ব
ব্রিটিশ সৈনিক



বাণিজ্য ছিল সম্পদ বহির্গমন আয়ের এক পন্থা| রাজস্ব থেকে যে টাকা হতো, সেই টাকা দিয়ে ভারতীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয় করে ইংল্যান্ডে পাঠানো হতো, একে বলা হতো Investment.

1766-68 খ্রিস্টাব্দ বাংলা থেকে 6 কোটি 3 লক্ষ পাউন্ড মূল্যের সম্পদ ইংল্যান্ডের চলে যায়| এইভাবে সম্পদ বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পথ খুব সহজ হয়ে উঠে| ভারতের শিল্প ধ্বংস, ভারতের মূলধনের ভয়াবহ ঘাটতি দেখা দেয়, বণিক-শিল্পী বেকার হয়ে পড়ে, ভারতের জীবনে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর অভিশাপ এবং সর্বোপরি ভারতের অর্থনীতি ধ্বসে যায়|


তথ্যসূত্র

  1. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, "পলাশী থেকে পার্টিশন"
  2. Dennis Kincaid, "British Social Life In India, 1608–1937".
  3. Stuart Reid, "The Battle of Plassey 1757".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. জাতীয়তাবাদ বলতে কি বুঝায় (আরো পড়ুন)
  2. বাজার অর্থনীতি কি (আরো পড়ুন)
  3. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Note: Email me for any questions:

    :-Click here:-.

    Note:- please share your feedback:

    :--Click here:--.

    Your Reaction ?

    Share this post with your friends

    please like the FB page and support us

    Previous
    Next Post »

    Top popular posts