নেলী সেনগুপ্তা এর আত্মজীবনী

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস বেশ কয়েকজন বিদেশিনীর মহিলার এক উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে| আমরা তাদের অবদানকে অস্বীকার করতে পারিনা| সেইসব বিদেশিনীর মহিলাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নেলী সেনগুপ্তা (Nellie Sengupta)| তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন|জন্মসূত্রে ভারতীয় না হলেও তিনি ভারতকে খুব ভালোবাসতেন|

নেলী-সেনগুপ্তা

নেলী সেনগুপ্তা 

জন্ম

তিনি 1886 খ্রিস্টাব্দে 12 ই জানুয়ারী ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন| কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির শহরের অধিবাসী মিস্টার ও মিসেস গ্রের একমাত্র সন্তান ছিলেন এডিথ এলেন গ্রে এবং তাঁর ডাক নাম ছিল নেলী| তাঁর বাবার নাম ছিল ফ্রেডারিক গ্রে ও তার মায়ের নাম ছিল এডিথ হেনরিয়েটা গ্রে|

তিনি ছোটবেলা সম্পর্কে বলেছিলেন, "বাবার সান্নিধ্য আমি খুব ভালোবাসতা| মা একাধারে ছিলেন আমার মা, বোন এবং আমার বন্ধু| চমৎকার একটি মানুষ আমার মা| গুন অনেক ছিল , ভালো রাঁধতে জানতেন, সেলাই এর কাজে ছিল খুব ভালো | এছাড়াও গান গান বাজনায় খুবই অতুলনীয় ছিল তার প্রতিভা "|

পাঠ্যজীবন

নেলীর পাঠ্যজীবন সিনিয়ার কেমব্রিজ অবধি ছিল, কেননা তিনি ভয়ংকর এক অসুখে পড়েছিলেন এবং অসুখ সেরে যাওয়ার পর তাঁর বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁর উপর কলেজের পড়াশোনার চাপ আর থাকবে না , তাই তিনি তাঁকে বাড়িতে পড়াতে শুরু করলেন| তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত পড়তে খুব ভাল লাগত এবং তিনি স্টেজ শো দেখতে যেতেন|

যুবক যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত 1906 খ্রিস্টাব্দে কেমব্রিজ  বিশ্ববিদ্যালয় এসেছিলেন| সেখানে যতীন্দ্রমোহন এর সঙ্গে নেলীর যোগাযোগ হয় এবং যোগাযোগের শেষে পরিণতি ছিল গভীর ভালবাসা| যতীন্দ্রমোহন ব্যবহারে সুমিষ্ট এবং ভদ্র ছিলেন| তিনি খুব সুন্দর ভাষণ দিতে পারতেন| প্রথম দিকে তাঁর মা তাদের ভালবাসার কথা জানতে পেরে বিরক্ত সহকারে তাঁকে বলেছিলেন -"অতদূরে তোমাকে যেতে হবে ! অচেনা-অজানা দেশ, সেখানে সারাজীবন তুমি থাকতে পারবে ? যদি তোমার জীবনে দুঃখ-কষ্ট আসে তাহলে তোমার কি হবে ? তুমি কার উপর নির্ভর করবে "| তখন নেলী তাঁর মাকে শান্তনা দিয়ে বলেছিলেন - "মা আমি যদি নিজে ভালো হই, তাহলে সবাই আমাকে ভালবাসবে|আমাকে তুমি আশীর্বাদ করো, আমি নতুন দেশে সুখে-শান্তিতে থাকবো "|


বিবাহিত জীবন

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এর বাবার নাম ছিল যাত্রামোহন| তিনি তৎকালীন সময়ে খ্যাতিনামা পুরুষ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ছিলেন এবং তিনি বাংলার প্রথম সারির অন্যতম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছিলেন| যাত্রা মোহন এক ব্যারিস্টার বন্ধুর রূপসী কন্যার সঙ্গে ছেলের বিবাহ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল| কিন্তু তিনি শুনতে পেলেন যে, তার ছেলে এক বিদেশিনি সঙ্গে বিবাহ করেছে, সুতরাং তিনি এলেন চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে এবং তাদেরকে সস্নেহে রহমতগঞ্জের বাড়িতে মহাসমারোহে নিয়ে যান|

বাঙ্গালী বধূর সাজে নেলী গ্রেকে ( সেনগুপ্তা ) তখন অসামান্য সুন্দরী মনে হচ্ছিল এবং যতীন্দ্রমোহনের মা নেলীকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিয়েছিল| শুরু হলো তাঁর বিবাহিত জীবন|

সেই সময় ভারতের রাজনৈতিক অধ্যায়ের একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছিল| তখন যতীন্দ্রমোহন শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছিল| ইতিমধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এর আকস্মিক পরলোকগমন ঘটেছিল, এরফলে বাংলার যুব সমাজের নেতা কে হবেন? এর উত্তর প্রাদেশিক কংগ্রেসের মহাত্মা চেয়েছিল| তখন প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও মৌলানা আবুল কালাম আজাদের অভিমত ছিল, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ছারা এই মুহুর্তে আর কাউকে বাংলার নেতা হিসাবে স্বীকার করা সম্ভব নয়| তারপর মহাত্মাজি বলেছেন যে, যতীন্দ্রমোহনই দেশবন্ধুর যোগ্যতম উত্তরাধিকারী| তার ফলস্বরূপ দেশবন্ধুর সিংহাসন যতীন্দ্রমোহনকে দেওয়া হল| যতীন্দ্রমোহন পরপর পাঁচবার কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন| প্রথম চারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শেষবার কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় ঘরোয়া মিলন অথবা সামাজিক অনুষ্ঠান ক্ষেত্রে জাতীয় নেতৃবৃন্দগণ প্রায় যতীন্দ্রমোহনের বাড়িতে আসত এবং তাদের অভ্যর্থনা দায়িত্ব  থাকতো নেলীর উপর| তাই স্বভাবত নেলী বিশিষ্ট জাতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল| ব্যক্তিগতভাবে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু, পন্ডিত মদনমোহন, সরোজনী নাইডু, মতিলাল নেহেরু প্রমুখগণ|

তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একের পর এক ঘটনা ঘটেছে, গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ মানুষের হয়েছে| মানুষের হৃদয় দ্বিখণ্ডিত হয়েছে, অনেকে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলছে, আবার অনেকে গান্ধীজীর অনুসৃত পথের পথিক হতে চাইছে|ব্যক্তিগতভাবে যতীন্দ্রমোহন ছিলেন ভদ্র , উদার এবং নিরঅহংকার মানুষ| তিনি সব কাজ সততা সহকারে করতেন| তাই তার স্ত্রী হিসেবে নেলীকেও নানা ধরনের সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত থাকতে হত| 1933 খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় নেলী সেনগুপ্তের সভানেতৃত্বে কংগ্রেসের অধিবেশন বসল এবং সেখানে নেলী এক অসাধারণ ভাষণের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে কংগ্রেসের কর্তব্য কি, সে বিষয়ে তাঁর নিজস্ব মতামত দিলেন| তৎকালীন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর ভাষণে সংক্ষিপ্তসার প্রকাশিত হয়েছিল|

যতীন্দ্রমোহনের পরলোক গমন

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত বারবার বন্দি অবস্থায় থাকার ফলে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল, তখন তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দী থাকা হয়েছিল, কলকাতার মেডিকেল কলেজে রোগের উপশম হলো না, তাই তাকে রাচীর অন্তরীন আবাসে পাঠানো ব্যবস্থা করা হলো এবং তার সঙ্গে নেলী সেনগুপ্তকে থাকার অনুমতি দেওয়া হলো| শেষ পর্যন্ত যতীন্দ্রমোহন পরলোকগমন করেন|


রাজনৈতিক জীবন 

যতীন্দ্রমোহন পরলোক গমনের ফলে তিনি খুব শোকগ্রস্ত হয়ে ছিলেন এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এবার তাকে আগের থেকে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে|এরপর তিনি বঙ্গীয় আইনসভার কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হলেন এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য শ্রীমতি কল্পনা দত্ত| এই দুই বিশিষ্ট মহিলার নির্বাচন তৎকালীন সময়ে খুব বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল| এমনকি জহরলাল নেহেরু নেলীকে  শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন এবং সেই নির্বাচনে নেলী বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন| তিনি আইনসভার সদস্য হয়ে কোনদিন অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি  , তাই তার সামনে যা অন্যায় বলে মনে হতো, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন এবং প্রতিবাদ করতেন|

অবশেষে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করল এবং ভারত সরকার তরফ থেকে নেলীকে এদেশে থাকার আমন্ত্রণ জানানো হলো, কিন্তু তিনি তাঁর স্বামীর জন্মস্থান চট্টগ্রাম থেকে আসতে চাইনি এবং অবশেষে তিনি চট্টগ্রামের থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন| সেখানেও তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে যুক্ত ছিলেন| পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি গণ আন্দোলনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে তিনি জড়িত ছিলেন| একবার তিনি 1952 খ্রিস্টাব্দে ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে ছাত্রদের উপর অমানুষিক অত্যাচার চালানো হচ্ছিল, তখন নেলী ছুটে গিয়েছিলেন নিপীড়িত নিগৃহীত ছাত্রদের মধ্যে|

পরলোক গমন 

এখন তাঁর যথেষ্ট বয়স হয়েছে, আর তিনি আগের মত কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটাতে পারতেন না| তাঁর ইচ্ছে ছিল, যতীন্দ্রমোহনের এক মূর্তি চট্টগ্রামে স্থাপন করা, শেষ পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছিল|জীবনের শেষ প্রান্তে অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার জন্য তিনি কলকাতার শহরে এসেছিলেন এবং 1973 খ্রিস্টাব্দে 23 শে অক্টোবর কলকাতার কলকাতায় তিনি পরলোকগমন করেন|

আজও আমরা তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকি|

                       ............................


নবীনতর পূর্বতন
👉 Join Our Whatsapp Group- Click here 🙋‍♂️

    
  
  
    👉 Join our Facebook Group- Click here 🙋‍♂️
  


  

   
  
  
    👉 Like our Facebook Page- Click here 🙋‍♂️

    👉 অনলাইনে মক টেস্ট দিন- Click here 📝📖 

👉 আজকের দিনের ইতিহাস - Click here 🌐 🙋‍♂️

    
  
           

 Join Telegram... Family Members
  
     
                
                






টেলিগ্রামে যোগ দিন ... পরিবারের সদস্য









নীচের ভিডিওটি ক্লিক করে জেনে নিন আমাদের ওয়েবসাইটটির ইতিহাস সম্পর্কিত পরিসেবাগুলি


পরিক্ষা দেন

ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে এবং নিজেকে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুত করুন- Click Here

আমাদের প্রয়োজনীয় পরিসেবা ?

Click Here