ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ভাবাদর্শ

16 শতকে আয়ারল্যান্ড জয়ের পর ব্রিটিশরা বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তারে অগ্রসর হয়| ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এই বিস্তার দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়- "প্রথম সাম্রাজ্য" যার বিস্তার ছিল আমেরিকার ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের দিকে| 1784 খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের শান্তি চুক্তির পর "দ্বিতীয় সাম্রাজ্য" বিস্তৃত হয় এশিয়া ও আফ্রিকার দিকে|

অষ্টাদশ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশরা গোঁড়ামির অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদেরকে বিশ্বের সভ্য জাতি হিসেবে প্রাচের লোকেদের সামনে তুলে ধরতে থাকে| এই প্রচেষ্টা উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাকে এক যথাথ্য রূপ প্রদান করে| ফলে রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার সঙ্গে বিচার শক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভারতবর্ষের জন্য সৃষ্টি হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ভাবাদর্শ| বিভিন্ন সময়ে এই ভাবাদর্শ পরিবর্তিত হলেও এর মূল কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি|
ব্রিটিশ-সাম্রাজ্যবাদী-ভাবাদর্শ

গির্জা



প্রাচ্যবিদ্যা বা Orientalism

1765 খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানির প্রশাসনিক কর্তারা মনে করতেন যে, তারা কোনো নতুন ধারণা ও শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তক নয় , উত্তরাধিকারী হিসাবে একটি জরাজীর্ণ ব্যবস্থার পুনঃপ্রচলন করার চেষ্টা করছেন| পাশ্চাত্যের একসময় মনে করতে হতো ভারতের একটি একটি গৌরবময় অতীত ছিল| সেই ধারনা বশতই স্যার উইলিয়াম জোন্স এর মত পণ্ডিতরা ভারতের অতীত , সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে জানার তাগিদ অনুভব করেছিলেন|

জোন্স গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষার সঙ্গে সংস্কৃত ভাষাগত যোগের কথা উল্লেখ করেন| ভারতের ইতিহাসে এই ঘরনা থেকে জন্ম হয় প্রাচ্যবিদ্যা বা Orientalism| প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার পরিণামে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি (1784), বারাণসীতে সংস্কৃত (1794) কলেজ স্থাপিত হয়| প্রাচ্য বিশারদরা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য চর্চা করে ভারতের অতীত ঐতিহ্য এবং এর অর্থ নির্ধারণের চেষ্টা করেন| তারা মনে করতেন, এই বিষয়ে তাদের জ্ঞানীই প্রকৃত ও অভ্রান্ত|

এডওয়ার্ড এর মতে, প্রাচ্যবিদ্যা বিষয়ক জ্ঞান ইউরোপীয়দের থেকে এসেছিল| কিন্তু ইউজিন আশিক এর মতে, প্রাচ্যবিদ্যা বিষয়ক জ্ঞান পারস্পরিক মতের আদান-প্রদান মধ্য দিয়ে এসেছিল| তিনি প্রাচ্যবিদ্যা প্রসারের ভারতীয়দের ভূমিকার কথা বললেও এই জ্ঞানচর্চার উদ্যোগে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রয়োজন মেটাবার উদ্দেশ্যকে ততটা গুরুত্ব দেয়নি|



ওয়ারেন হেস্টিংস

ওয়ারেন হেস্টিং এর সময় কোম্পানির প্রশাসনিক নীতির মধ্যে প্রাচ্যদেশীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম পরিচয়| মেলে তাঁর নীতি ছিল বিজিত এলাকায় লোকেদের শাসন করতে হলে তাদের আইন-কানুনের সাহায্য নেওয়া উচিত| গৌরী বিশ্বনাথের মতে, ব্রিটিশ সংস্কৃতি বিপরীত নীতি অনুসরণ করে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল, এর ফলে ইউরোপীয়রা এদেশের রীতিনীতি ও আইন-কানুন জানতে পারে|

এই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি নিয়ে 1800 খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির কর্মচারীদের ভারতীয় ভাষা ও ও ঐতিহ্যে করার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়| টমাস টাউটম্যানের মতে, প্রাচ্যবিদ্যার পেছনে ভারতীয় ও ইংরেজদের আত্মীয়তার বিষয়টি তুলে ধরে| প্রাচ্য বিশারদরা মনে করতেন, ইউরোপীয় সভ্যতার অগ্রগতিকে সামনে রেখে ভারতীয় সভ্যতার উন্নতি ঘটাতে হবে| লড কর্নওয়ালিস হোস্টিং এর নীতি পরিত্যাগ করে "প্রাচ্যদেশীয় স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থার" প্রচলন করেছিলেন| তিনি মনে করতেন যে, ভারতীয়দের দুর্নীতিগ্রস্ত অত্যাচারী সামন্ত প্রভুদের হাত থেকে রক্ষা করা দরকার|



বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মতামত

এরিক স্টক এর মতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রশাসনের স্পষ্ট দুটি ধারা ছিল| একদিকে ছিল বাংলার কনওয়ালিস নীতি যার মূল বক্তব্য ছিল, আইনের শাসন ও সম্পত্তির অধিকার মানুষকে সনাতন ঐশ্বর্যের বন্ধন থেকে মুক্ত করবে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণের উৎসাহিত করবে| অন্যদিকে মাদ্রাজের টমাসমুনরো, উত্তর ভারতের এলফিনস্টোন, মেটকাফ প্রমুখরা ক্ষমতার বিভাজন ঘটনার বিরোধিতার পাশাপাশি ভারতের রাজনৈতিক ঐশ্বর্যের ব্যক্তিগত শাসনে ধারাটিকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিলেন|



শিল্প বিপ্লব

ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের ফলে 1800 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভারতের বিভিন্ন অংশের বাজারগুলিকে সংযুক্ত ও উন্নত করার একান্ত দরকার হয়ে পড়ে| এর উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিটেনে শিল্পজাত পণ্যকে ভারতের সরবরাহ করা এবং ভারতকে ব্রিটেনে কাঁচামাল সরবরাহকারি রাষ্ট্রে পরিণত করা| ব্রিটেনে অবাধ বাণিজ্যের বিশ্বাসী বণিকদের স্বার্থে প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠী ছিল| এই গোষ্ঠী কোম্পানি বাণিজ্যিক আধিপত্য অবসানে চেষ্টা করে| ব্রিটিশ প্রশাসকদের মধ্যে ইভানজেলিক্যাল আদর্শ এবং utilitism আদর্শ ও ভারতের সাম্রাজ্যে নতুন রুপরেখা কথা বললেও, তারা ভারত থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য উচ্ছেদের কথা না বলে তার সংস্কারের কথা বলেন|



ইভানজেলিক্যাল

মূলত শ্রীরামপুর মিশনের মিশনারিদের দ্বারা খ্রিষ্টীয় ইভানজেলিক্যাল ভাববাদীগণ বলেন যে, হিন্দুস্তানের প্রকৃতিগত পরিবর্তন ঘটানোর উদ্দেশ্যে ভারতে ব্রিটিশ শাসন স্থায়ীভাবে থাকা দরকার| ব্রিটেনে এই মতের প্রবক্তা ছিলেন চার্লস গ্রান্ট| 

1792 খ্রিস্টাব্দে তিনি বলেন যে, ভারতবাসীর বড় সমস্যা হলো ধর্মীয় ভাবনা যা তাদের অজ্ঞতাকে স্থায়ী করেছিল| খ্রিষ্টীয় ধর্মের আদর্শ প্রচার করে এই অজ্ঞতাকে দূর করা সম্ভব| এই উদ্দেশ্যে ভারতে স্থায়ী ব্রিটিশ শাসন দরকার বলে তিনি মনে করতেন|

 গ্রান্টের মতে , বস্তুগত সমৃদ্ধি পরিপূরক হলো সমাজের মানুষদের জ্ঞানবুদ্ধি ও শিক্ষা-দীক্ষার সুসভ্য করে তোলার প্রক্রিয়া| তিনি মনে করেছিলেন যে, এর ফলে ভারতীয়রা কোন দিন স্বাধীনতা লাভের প্রয়াসী হবে না| মূলত গ্রান্টের উদ্যোগে 1813 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সংসদে চার্টার অ্যাক্ট পাস হয়, তার ফলে খিষ্টান মিশনারীরা ভারতে বিনা বাধায় ঢুকে পড়েন|



উপযোগবাদ

জেরেমি বেন্থাম মনে করতেন যে ব্রিটিশ শিক্ষার গুণ, জ্ঞানদীপ্ত ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে ভারতবাসী স্বাবলম্বী হয়েছে| আবার অপরদিকে উদারনৈতিক উপযোগীবাদী জেমস মিল "The History of British India" গ্রন্থে বলেছেন যে, ভারতবর্ষে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন এমন সরকারে যা ভারতে উন্নয়ন ঘটাতে পারবে |

মিলের উদ্যোগে 1833 খ্রিস্টাব্দে লর্ড মেকলে নেতৃত্বে গঠিত হয় আইন কমিশন| 1858 খ্রিস্টাব্দে অনুকরণে ভারতীয় দণ্ডবিধি বা Indian penal code রচনা করে| বেন্থামের আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং জেমস মিলের অনুগামী লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক আইনের মাধ্যমে সতীদাহ প্রথা ও শিশু হত্যা বন্ধ করেন| সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তীতে ভারতে 1857 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে ,তা মূলত উদারনৈতিক উপযোগীতাবাদী আদর্শকে অনুসরণ করে চলেছিল|

ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদী শাসন সময়ের সাথে সাথে ভাবাদর্শগত ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে| এই আদর্শের মূল লক্ষ্য ছিল, ভারতবাসীকে কিছু সুবিধা প্রদান করে তাদেরকে একটি মাত্র আইনের আওতায় নিয়ে আসা|

                 .......................................

নবীনতর পূর্বতন
👉 Join Our Whatsapp Group- Click here 🙋‍♂️

    
  
  
    👉 Join our Facebook Group- Click here 🙋‍♂️
  


  

   
  
  
    👉 Like our Facebook Page- Click here 🙋‍♂️

    👉 Online Moke Test- Click here 📝📖 

    
  
           

 Join Telegram... Family Members
  
     
                
                






টেলিগ্রামে যোগ দিন ... পরিবারের সদস্য









নীচের ভিডিওটি ক্লিক করে জেনে নিন আমাদের ওয়েবসাইটটির ইতিহাস সম্পর্কিত পরিসেবাগুলি


পরিক্ষা দেন

ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে এবং নিজেকে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুত করুন- Click Here

আমাদের প্রয়োজনীয় পরিসেবা ?

Click Here

ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

Delivered by FeedBurner