ভারতে শিল্প বিকাশের ইতিহাস

"The cambridge economic history of india"-গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে ভারতবর্ষে শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে মরিস.ডি.মরিসের দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনায় আমরা ভারতবর্ষে শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি|

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়কালে ব্রিটিশ সরকার ছিল অবাধ বাণিজ্য নীতির সমর্থক| ভারত সম্পর্কে তাদের বাণিজ্য নীতি ছিল, কাঁচামাল ও খাদ্যশস্যের রপ্তানি এবং ব্রিটেন থেকে শিল্পজাত পণ্যের আমদানি| ভারতের শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের ব্যাপারে সরকারের কোনো সহযোগিতা মূলক নীতি ছিল না | 1905 খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রথম শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল|

উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে যদিও শিল্প বিকাশ ঘটেছিল, কিন্তু তার গতি ছিল মন্থর| যেটুকু শিল্প উদ্যোগ ভারতে দেখা দেয়, তা মূলত পাট শিল্প ও বস্ত্র শিল্পকে কেন্দ্র করে| একদিকে শিল্প শিল্প উদ্যোগে ছিল না রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, আবার অন্যদিকে শিল্প উদ্যোগীদের নানা প্রতিবন্ধকতা| এসব সত্ত্বেও কয়েকটি শিল্পে ভারতবর্ষ বিশেষ সাফল্য লাভ করেছিল|

ভারতে-শিল্প-বিকাশের-ইতিহাস
ফ্যাক্টরী




পাট শিল্প

কৃষি কাজের সস্তা বিকল্প হিসেবে উনিশ শতকের গোড়ায় বাংলায় পাটের চলন হয়| বাংলা থেকে প্রধানত কাঁচা পাট সরবরাহ করা হত ডান্ডিতে কারখানাগুলির উদ্দেশ্যে| 1855 খ্রিস্টাব্দে বাংলায় প্রথম চটকল চালু হয়| উনিশ শতকের শেষের দিকে অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বাজার পাট শিল্পের কাছে অবাধ হয়ে যায়| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পাটের চাহিদা বিপুল পরিমাণ বেড়ে যায়| এতে মূলধনের পরিমাণ ছিল 79.3 মিলিয়ন টাকা|

1918-19 খ্রিস্টাব্দে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় 106.4 মিলিয়ন টাকা| 1922-23 খ্রিস্টাব্দে এর পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেয়ে হয় 179.4 মিলিয়ন টাকা | তবে পাট শিল্পে নিয়োজিত মূলধনের একটা বিপুল পরিমাণ অংশ ছিল ব্রিটিশ মূলধন| 1929 খ্রিস্টাব্দে মহামন্দার আগে পর্যন্ত পাট শিল্প লাভজনক ছিল| কিন্তু মহামন্দার সময় পাটের রপ্তানি ও তা থেকে প্রকৃত লাভ দুই পড়তে থাকে|

1920 দশক থেকে কিছু মারোয়ারী ব্যবসায়ীরা পাট শিল্পে টাকা বিনিয়োগ করতে শুরু করে| 1922 খ্রিস্টাব্দে জি. ডি. বিরলা নাগাদ ও স্বরূপ চাঁদ-হুকুম চাঁদ নিজেদের চটকল স্থাপন করে| নিজেদের চটকলসহ পাট শিল্পে মারোয়ারীদের প্রবেশের ফলে সমস্ত চটকলের 10% তাদের নিয়ন্ত্রণ আসে|

ভারতে-শিল্প-বিকাশের-ইতিহাস
পাটের বস্তা

ভারতে-শিল্প-বিকাশের-ইতিহাস
পাটের ব্যাগ



অধ্যাপক অমিয় বাগচী মনে করেন, "ভারতীয় বস্ত্র শিল্পকে যেমন দেশে এবং বিদেশে উভয়স্থানে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়, তেমনি পাট শিল্পের ক্ষেত্রে তা কিন্তু ঘটেনি"|

1939 খ্রিষ্টাব্দকে ভিত্তি বছর ধরলে 1945 খ্রিস্টাব্দে দেখা যায় ভারতের অন্যান্য শিল্পের মুনাফা সূচক দাঁড়িয়েছিল 234, সেখানে পাট শিল্পের সূচক ছিল 328  .



বস্ত্র শিল্প

পশ্চিম ভারতের সুতিবস্ত্র শিল্পের ভারতীয় শিল্পপতিদের
প্রকৃত সাফল্য আসে| যুদ্ধকালীন বিদেশ থেকে বস্ত্র আমদানি কমে যায়| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ভারতের সুতিবস্ত্র শিল্প ছিল গুজরাটের বানিয়া, ঘোরা, ঘাটিয়া সম্প্রদায়ের হাতে| বস্ত্র শিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এবং 1920 দশকে| 1930 দশকে জাপানি বস্ত্র এদেশে আমদানি করা হতে থাকে, তাতে বস্ত্র শিল্পের উন্নয়ন সাময়িকভাবে ধাক্কা খায়, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া মধ্যে ভারতের বস্ত্র শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটে|


লৌহ-ইস্পাত শিল্প

টাটা আয়রন এন্ড ষ্টীল কম্পানি নেতৃত্বে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয় লৌহ-ইস্পাত শিল্প| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকারি উদ্যোগে লৌহ ও ইস্পাত সামগ্রী কেনার নতুন নীতি গৃহীত হয়| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এই শিল্পে বেশ কিছু উন্নতি ঘটে, কিন্তু সরকারী উদাসীনের ফলে শিল্পটি প্রসার কিছুটা ব্যাহত হয়|


মূল্যায়ন

উক্ত শিল্পগুলি ছাড়াও দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময় কয়লা, কাগজ, চিনি, কাঁচ, দেশলাই এবং রাসায়নিক শিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটে|

দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে শিল্পের বিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আধুনিক শিল্প বিকাশে অনুকূল পরিবেশ ছিল না তা নয়, কিন্তু ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের স্বার্থে উপনিবেশিক সরকার এই শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অবশ্য ইংরেজদের নীতি অনেকটা পরিবর্তন হয়েছিল| এই সময় থেকে দেশীয় শিল্পের উত্থান ঘটতে থাকে| এই ক্ষেত্রে সব থেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল বস্ত্র শিল্প| জাতীয়তাবাদী লেখকগণ মনে করেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইংল্যান্ডে ক্রমশ ভারতীয় শিল্পপতিদের কাছ থেকে আত্মসমর্পণ করতে থাকে, 1935-39 খ্রিস্টাব্দে ইন্দো-ব্রিটিশ বাণিজ্য চুক্তি ছিল এর প্রমাণ|


তথ্যসূত্র

  1. Sojin Shin, "The State, Society, and Foreign Capital in India".
  2. Tirthankar Roy, "A Business History of India"

সম্পর্কিত বিষয়

  1. সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব এবং এটি কিভাবে বাংলার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল  (আরো পড়ুন)
  2. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Previous Post Next Post

    মক টেস্ট

    ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে- Click Here

    সাহায্যের প্রয়োজন ?

    প্রশ্ন করুন- Click Here

    ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

    নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

    Delivered by FeedBurner