Tuesday, 6 November 2018

মধ্যযুগের জলসেচ ব্যবস্থা এবং পার্সিয়ান হুইল সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

SHARE
ভারতবর্ষের শেষ শতকে মধ্যভাগের আগে পর্যন্ত মাটির নিচের জল বিশেষ করে নদীর তীরবর্তী অঞ্চল গুলিতে খুব নিকটে পাওয়া যেত| বিশেষ করে বর্ষাকালে কূপ খূড়ে যাকে কচ্ছপ কূপ বলা হতো, তা থেকে জল তোলা হত| ভারতবর্ষে প্রথম সিন্ধু সভ্যতাতে মাটির পাট ব্যবহার করা হতো, কেবলমাত্র মহেঞ্জোদারোতেই যে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হত তা নয়, কড়াচির কাছে আল্লাহ দীনোতে এই পদ্ধতিতে শেষ করা হতো| তবে তখন জলের পাত্রগুলিকে সরাসরি হাত দিয়ে তোলা হতো, সে সময় জল তোলার কোন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি| পরবর্তীকালে 1000 খ্রিঃ পূর্বাব্দে নাগাদ ঋক বৈদিক যুগে জল তোলার চাকা ব্যবহার হতো, যার নাম ছিল অশ্মচক্র| পরবর্তীকালে বৌদ্ধ গ্রন্থদীতে নরিয়ার অনুরূপ পদ্ধতি ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়|
মধ্যযুগের-জলসেচ-ব্যবস্থা-এবং-পার্সিয়ান-হুইল-সম্পর্কে-সংক্ষিপ্ত-ইতিহাস

কৃষি জমি


নরিয়া হলো একটি বৈজ্ঞানিক নাম| নরিয়া হলো একটি লম্বভাবে দন্ডায়মান চাকা, যার সঙ্গে জলের পাত্রগুলিকে সংযুক্ত করা হত, এই চাকাটি জলের জায়গাতে স্থাপন করা হতো| এই চাকা জলের পাত্রগুলি জলে পূর্ণ হত যখন চাকাটি জলের মধ্যে প্রবেশ করত এবং তারপর চাকাটি ঘূর্ণনের সাথে পরপর জলের পাত্রগুলি বেরিয়ে আসত| পাত্রগুলি যখন চাকার ওপর উঠত এবং ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামত তখন সেগুলির জল ফাঁকা হয়ে যেত| এই জল একটি ধারার মধ্য দিয়ে সেচের কাজে লাগানো হতো| ভারতবর্ষে খ্রিস্টপূর্ব 300 অব্দ নাগাদ নরিয়া ব্যবস্থার কথা জানতে পারা যায় পঞ্চতন্ত্র থেকে, যেখানে একজন মানুষ এটি জানতো| এখানে হাত আরছাট্টণ শব্দটি পাওয়া যায়, যার অর্থ হলো মাটির পাত্রের সঙ্গে যুক্ত চাকা| এই পদ্ধতিতে অনেক বেশি গভীর কূপ থেকে জল তোলা যেত| স্পোক লাগানো চাকা এবং দড়ির সাহায্যে এতে চাকার সঙ্গে জলের পাত্র মালার মতো যুক্ত করা থাকত| কিন্তু এই পদ্ধতিতে যেহেতু জলের পাত্রগুলি অনেক ভারী হতো, ফলে লম্বভাবে দন্ডায়মান চাকাটি ঘোরানো বেশ কষ্টকর ছিল|

সিরাজ-ই-ফিরোজশাহীতে কূপ এবং চাকার সঙ্গে জল তোলার পাত্রের সংযুক্তির বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়| সুলতান ফিরোজশাহ তুঘলক একটি সুসংগঠিত জলাশয় দিল্লিতে খনন করেছে, কিন্তু সেখানে পশুশক্তি ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায় না| বাবর দড়ির সঙ্গে যুক্ত জল তোলার পাত্রের মালা দৈহিক শ্রমের দ্বারা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছে| সেই সময় অর্থাৎ 1530 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পার্সিয়ান হুইল বা persian wheel বা পারসিক চাকার ব্যবহারের কথা জানা ছিল না| তবে বর্তমানে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, বাবর তার গ্রন্থে দৈহিক শক্তি দ্বারা পাত্রের মালা দ্বারা জল তোলার যে কথা বলেছেন তা অনুবাদ অনুবাদও ভুল ব্যাখ্যা করেছেন| তাদের মতে, যন্ত্রের মাধ্যমে জল তোলার পারসিক চাকার পরিপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায়| বাবর লাহোর, দিপালপুর, সিরহিন্দ প্রভৃতি স্থানে এই পদ্ধতিতে জল তোলার কথা বলেছেন| তিনি বলেছেন একটি লম্বভাবে দন্ডায়মান চাকাকে কুপের উপর লাগানো হতো| এই চাকার সঙ্গে অপর একটি চাকা যুক্ত থাকত| যার কগ  তৃতীয় আর একটি সমন্তরাল চাকার কগের সঙ্গে যুক্ত থাকতো| সর্বশেষ চাকাটি ষাঁড়ের দ্বারা ঘোরানো হতো এবং এই গতিশক্তি কুপের চাকাটির মধ্যে সঞ্চারিত হতো| এর ফলে কুপের ওপর স্থাপিত চাকাটি ঘুরত| এই চাকাটি দড়ির দ্বারা মালার মতো জল তোলার পাত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে|


এই পদ্ধতি ভারতে এসেছিল ইরাক থেকে দ্বাদশ শতাব্দী নাগাদ| 1500 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এটি ব্যাপক প্রচলন ভারতবর্ষে শুরু হয়েছিল| বাবরের সময়ে এর বিশেষ প্রচলন ছিল| সিন্ধে এই পদ্ধতির এই সময় ব্যাপক প্রচলন ঘটে| তখন পশুশক্তি হিসেবে উটের ব্যবহার ছিল, অন্যদিকে আমাদের পূর্ববর্তী উৎসগুলিতে এই গিয়ার গুলিতে জল তোলার পদ্ধতির কথা জানান যেত|
মধ্যযুগের-জলসেচ-ব্যবস্থা-এবং-পার্সিয়ান-হুইল-সম্পর্কে-সংক্ষিপ্ত-ইতিহাস-2

পার্সিয়ান হুইল 


এই পার্সিয়ান হুইল বা persian wheel বা পারসিক চাকার  ভারতবর্ষে বিশেষ করে শুষ্ক সিন্ধু অঞ্চলগুলিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এই পদ্ধতির সাহায্যে মাটির নিচের জল কাছাকাছি থাকে এবং সব সময় জল তোলার সহজ হতো| যখন জলের গভীরতা নিচে দিকে পৌঁছে যেত, তখন সুবিধার জন্য জলের পাত্রের ওজন কমিয়ে দেওয়া হতো|

পারসিক চাকায় কাঠের গিয়ার ব্যবহার করা হতো| পাশাপাশি পারসিক চাকা যন্ত্রাংশে উন্নতি করার প্রচেষ্টাও ছিল, যাতে অনেক উঁচু জায়গা থেকে জল তোলা যায়| এই পদ্ধতি চালু করা হয় একটি দন্ডযুক্ত ও ঘুর্ননকে লম্বভাবে স্থাপন করে, যা একেবারে মাথায় লম্বভাবে একটি চাকা লাগানো থাকত| যার কিলক লম্বভাবে প্রতিষ্টিত চাকার কগের সঙ্গে যুক্ত থাকতো, যেটি আবার যুক্ত থাকতো একই অক্ষরের সঙ্গে| এর ফলে কুপের চাকাটি ঘোড়ার সাথে সাথে পরপর লাগানো পাত্রগুলি জল তুলত| এই পদ্ধতিতে জল তোলার কথা আবুল ফজলের রচনা থেকে জানা যায় এবং আকবরের সময় অঙ্কিত দুটি চিত্র পাওয়া যায়| মুঘল বাগানে এই পদ্ধতিতে জল তোলা হতো|

কাঠের পারসিক চাকা জলের পাত্রগুলির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত| উনিশ শতকের শেষের দিক পর্যন্ত সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে জল তোলার এই পদ্ধতি বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল| ধাতুর তৈরি চাকা চেনযুক্ত বালটি ব্যবহার শুরু হলে উক্ত পদ্ধতি ব্যবহারহীন হয়ে পড়ে| আধুনিক কালে ডিজেল, বিদ্যুতের ব্যবহার এই পদ্ধতিকে অতীত করে দিয়েছে|

খাল ও জলাশয় দ্বারা জলসেচ পদ্ধতিও ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল| মধ্যযুগে দক্ষিণ ভারতের জলসেচ ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিল| কাবেরী নদীর ওপর একাদশ শতকে 300 মিটার লম্বা,  5.5 মিটার উঁচু এবং 18 মিটার চওড়া একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, সেসঙ্গে জলসেচের জন্য খাল কাটা হয়েছিল| 15 শতকে কুমুদবতী নদীর ওপর একটি বাঁধ নির্মাণ করে বিশাল আকার জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছিল সেচের জন্য| বিজয়নগর রাজাদের আমলে সচারচর মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণের নিদর্শন পাওয়া যায়| ফিরোজশাহ তুঘলক দিল্লিতে একটি খাল খনন করে, যেটি 34.7 মিটার লম্বা ছিল| এই খালে প্রয়োজন মতো জল আটকাবার এবং জল সরবরাহ করার ব্যবস্থা ছিল|

ফিরোজশাহ তুঘলকের সময় উত্তর ভারতে আরো অনেক খাল খনন করা হয়েছিল| তিনি শতদ্রু এবং যমুনা নদীর ওপর এবং অন্যান্য ছোটখাটো নদীতে খাল খনন করেছিলেন| আমরা শাহজাহানের আমলে খাল খননের অনেক নিদর্শন পাই|

শাহজাহান রবি খাল খনন করে এবং সেখানে পরিকল্পনা করে নদী থেকে জল লাহোরে আনার চেষ্টা করা হয়|  দুইবার এই খাল খোরা হয়েছিল, কিন্তু লাহোরে জল পৌঁছানো সম্ভব হয়নি| শেষ পর্যন্ত তৃতীয়বারের চেষ্টায় লাহোরে জল নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়| শাহজাহান পশ্চিম যমুনা নদীর উপর একটি খাল খনন করেছিলেন|

এই সকল পদ্ধতির মাধ্যমে মধ্যযুগের জলসেচ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল| আধুনিককালে এই সকল ব্যবস্থার বহু উন্নতি সাধন করে আজকের রুপ লাভ করেছে|

তথ্যসূত্র

1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ী, "মধ্যকালীন ভারত"
2.অনিরুদ্ধ রায়, "মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস"
3. V D Mahajan, "History of Medieval India"
4.Chandra Satish, "A History of Medieval India"
5.Satish Chandra, "Medieval India: From Sultanat to the Mughals- Mughal Empire (1526-1748) - 2"
               ..................................................
SHARE

Author: verified_user

0 Comments: