মধ্যযুগীয় ভারতের ভক্তি আন্দোলনের উদ্ভব এবং বিকাশ

ভক্তি বলতে বুঝায়, ঈশ্বরের কাছে ভক্তের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ| ত্রয়োদশ শতকের নাগাদ ধর্মীয় ভক্তিবাদের ধারা দক্ষিণ থেকে উত্তর ভারতে সম্প্রসারিত হয়| সহজ, সরল এবং একান্তভাবে মানবিক ভক্তিবাদী তত্ত্ব সমাজের এক বৃহত্তর অংশে আন্তরিকতার সাথে গৃহীত হয়|

তৎকালীন সমাজ, চিন্তা, সাহিত্য, সংস্কৃতির উপর ভক্তিবাদ যে প্রভাব ফেলে তাকে এককথায় আন্দোলন বলা চলে| ঐতিহাসিক শ্রীবাস্তব বলেছেন, "বৌদ্ধ ধর্মের পতনের পর আমাদের দেশে ভক্তিবাদী আন্দোলনের মত এক ব্যাপক ও জনপ্রিয় আন্দোলন আর সংঘটিত হয়নি"|
মধ্যযুগীয়_ভারতের_ভক্তি_আন্দোলনের_উদ্ভব_এবং_বিকাশ

ভক্তির অগ্নিশিখা


উদ্ভব

ভক্তিবাদীর মূলকথা হলো আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন, অর্থাৎ মানুষের সাথে ঈশ্বরের মিলন| ড: তারা চাঁদ, ইউসুফ হোসেন, ড: কুরেশী প্রমূখ ঐতিহাসিকদের মতে, ইসলাম থেকে হিন্দু ধর্মে ভক্তির প্রবেশ ঘটেছে| তাদের মতে ইসলামে একেশ্বরবাদ ও আল্লাহের প্রতি আত্মসমর্পণ ভক্তিবাদী প্রচারকদের প্রভাবিত করে| এইসব প্রচারকরা মনে করেন, জটিল আচার-অনুষ্ঠান ত্যাগ করে একমাত্র ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে|

ভক্তিবাদীর উন্মেষে সুফিবাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ| সুফিসন্তরা আল্লাহের প্রতি ভক্তিকে মুক্তির একমাত্র পথ বলে অভিহিত করেন| তারা অতীন্দ্রিয়, ভক্তিতত্ত্ব, নৈতিকতা এবং হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ের উপর জোর দেয়|


ম্যাক্স ওয়েবারমাক্স ভেবার প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, ভক্তির মাধ্যমে মুক্তির চিন্তা খ্রিস্টধর্ম থেকে এসেছে| বার্নেট এবং অন্যান্য অনেকে এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে বলেন যে, দেশীয় উপাদানগুলির মধ্যে ভক্তির উৎস নিহিত আছে|বলা যায় যে, "বেদের অভ্যন্তরে "ভক্তি" বীজ নিহিত| গীতায় শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞান, ভক্তি ও কর্ম এই তিনটি কথা বলেছেন| বিষ্ণুপুরাণে ভক্তিবাদের উল্লেখ রয়েছে"|

খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে দাক্ষিণাত্যে প্রকৃতপক্ষে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়| শৈব নায়নার বৈষ্ণব আলওয়ার সম্প্রদায় এই আন্দোলনের সূচনা করে| তার জাতিভেদ প্রথা ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তির আদর্শকে তুলে ধরে| তাদের উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম থেকে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে এনে সর্বশেষ্ঠ দেবতার পূজার প্রতি তাদের আকৃষ্ট করা| তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা ছিল শিব ও বিষ্ণু|

মধ্যযুগীয়_ভারতের_ভক্তি_আন্দোলনের_উদ্ভব_এবং_বিকাশ

শিব ও বিষ্ণু


ভক্তি আন্দোলনের এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিও ছিল| হিন্দু সমাজের উচ্চবর্ণের লোকেরা ছিল খুঁত, মুকাথদ্দম ও সামন্তশ্রেণীর লোক| মুসলিম শাসক শ্রেণীও ছিল সামন্ততান্ত্রিক| দরিদ্র, কৃষক, নিম্ন বর্ণের মানুষ এবং শহরের কারিগরশ্রেনী ছিল নিপীড়িত ও শাসিত| ভক্তিবাদ সামাজিক ন্যায়ের তত্ত্ব প্রচার করে এই সকল মানুষকে আকৃষ্ট করে|

বিকাশ 

ভক্তিবাদ ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে| মধ্যযুগে ভারতে বহু ভক্তিবাদী সাধকের আবির্ভাব ঘটে| এদের মধ্যে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য হরেন হলেন- রামানুজ, রামানন্দ, কবীর,  গুরু নানক, শ্রী চৈতন্য দেব, মীরাবাঈ প্রমুখেরা|



রামানুজ

ভক্তি ধর্মের আদি প্রচারক ছিলেন রামানুজ ( 1017 খ্রিঃ-1137 খ্রিঃ )| 1017 খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের শ্রী পেরাম পুদুরে তাঁর জন্ম| রামানুজ বলতেন, জ্ঞান মুক্তির একমাত্র পথ নয় অন্যতম পথ|

তিনি মুক্তির জন্য জ্ঞানের পরিবর্তে ভক্তির উপর বেশি জোর দেন|রামানুজ হিন্দু দর্শন ও যুক্তিবাদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করেছিলেন|

রামানন্দ 

দক্ষিণ ভারত থেকে উত্তর ভারতে ভক্তিবাদের বাণী বহন করে আনে রামানন্দ| রামানন্দ বর্ণভেদ প্রথা নির্মূল করার কথা বলেনি, তবে তিনি বর্ণভেদ প্রথার কঠোরতার হ্রাস করার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ভূমিকা নেন|

তাঁর শিষ্যদের মধ্যে সমস্ত জাতির মানুষ ছিল| তিনি হিন্দি ভাষায় কবিতা রচনা করে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তির বাণী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়|

কবীর 

কথিত আছে যে, কবীর ছিলেন এক ব্রাহ্মণ বিধবার সন্তান| মা কর্তৃক পরিতক্ত হয়ে তিনি এক মুসলমান তাঁতির ঘরে পালিত হন| প্রথম জীবনে তিনি রামানন্দের ভক্ত ছিলেন| পরে তিনি নিজের ধারণা প্রচার করতে শুরু করেন|

তিনি ধর্মীয় উদারতার সঙ্গে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন দাবি করেন| তিনি বলতেন, "ঈশ্বর এক কেবল নামই ভিন্ন| তাঁর মতে আল্লাহ ও রাম একই ঈশ্বরে আলাদা নাম"| তিনি বলতেন, ঈশ্বরের অধিষ্ঠান মানুষের হৃদয়ের মধ্যে| দুই লাইনের এক একটি লোকের শ্লোকের তিনি অন্তত সহজ সরলভাবে তাঁর বক্তব্য প্রচার করেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর প্রভাব ছিল বেশি|

গুরু নানক

নানক ( এপ্রিল 15, 1469 খ্রিঃ - সেপ্টেম্বর 22, 1539 খ্রিঃ ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন পাঞ্জাবের তালবন্দী গ্রামে, অল্প বয়সে সংসার ত্যাগ করে তিনি সুফিসন্তদের সাথে যোগদান করেন|

কিছুকাল পরে তাদের ত্যাগ করে দেশে নানা স্থানে তিনি ভ্রমণ করেন| তাঁর উদ্দেশ্যাবলী উদ্দেশ্যাবলী "আদি গ্রন্থ" পুস্তকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে| তিনি বলেন, প্রেম ও ভক্তি সহকারে বারবার ঈশ্বরের নাম জোপলে মোক্ষ লাভ করবে|

শ্রী চৈতন্য দেব

শ্রী চৈতন্য দেব ( 1486 খ্রিঃ - 1533 খ্রিঃ ) নবদ্বীপের এক ধনী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ছেলেবেলাতে ব্যাকরণ, ন্যায়, দর্শন প্রভৃতি নানা শাস্ত্রে তিনি গভীর ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন| এবং তিনি অসাধারণ পন্ডিত বলে খ্যাতি অর্জন করেন| 22 বছর বয়সে তিনি বৈষ্ণব গুরু ঈশ্বর পুরীর কাছে কৃষ্ণ মন্ত্রের দীক্ষা লাভ করে এবং 24 বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করে তিনি বৈষ্ণব ধর্মের মূল মন্ত্র বৈরাগ্য, বিশুদ্ধ প্রেম, ভক্তি ও জীবে দয়ার আদর্শ প্রচারে ব্রতী হন| তাঁর অনুগামীদের তিনি তৃণের মত নম্র ও নিরহঙ্কারী হওয়ার উপদেশ দিতেন|


শ্রী চৈতন্য প্রচারিত ধর্ম বৈষ্ণবধর্ম নামে প্রচারিত| তিনি জাতিভেদ ও ব্রাহ্মণের প্রাধান্য অস্বীকার করে সমগ্র মানব সমাজের জন্য প্রেমধর্ম প্রচার করেন| তিনি মনে করতেন যে, সকল মানুষ হলো সমান আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী| উত্তর ও দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করে তিনি প্রেম ধর্মের বন্যা প্রবাহিত করেন| সব ধর্ম ও জাতের মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন| তাঁর শিষ্যদের মধ্যে উড়িষ্যার প্রতাপ রুদ্রদেব, নিত্যানন্দ, শ্রীবাস, রূপ সনাতনজগন হরিদাস সকলে ছিলেন| তাঁর প্রচারিত ধর্ম গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম   নামে প্রচলিত|

শ্রী চৈতন্যদেব মতাদর্শ সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে| পূর্ব ভারত তথা বঙ্গীয় জনজীবনে তাঁর সর্বার্থ প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে ড: সুকুমার সেন মন্তব্য করে বলেন যে, "তাঁর অপূর্ব প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালির প্রতিভা কি ধর্মে, কি দার্শনিক চিন্তা, কি সাহিত্যে, কি সঙ্গীত কলায় সর্বত্র বিচিত্রভাবে স্ফূর্ত হতে থাকে, এটিই হলো বাঙালি জাতির প্রথম জাগরণ"|


মীরাবাঈ 

ভক্তিবাদের প্রচারে শিশোদিয়া রাজ পরিবারের বধূ মীরাবাঈ উল্লেখযোগ্য নাম| তিনি অল্প বয়সে কৃষ্ণ প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে উঠেন| তিনি মনে করতেন, ভক্তি ও ভালোবাসার দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করা যায়| তার প্রচারের ফলে রাজপুতানায় কৃষ্ণ প্রেমের প্রচার ঘটে| তিনি সংগীতের মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি নিবেদন করতেন যা মীরার ভজন নামে আজকের দিনে প্রচলিত|

ভারতীয় ধর্ম ও সমাজের উপর প্রভাব ছিল যথেষ্ট| ঐতিহাসিক শ্রীবাস্তব বলেছেন, ভক্তিবাদের দুটি লক্ষ্য ছিল, 1. হিন্দু ধর্মের সংস্কার| 2. হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে বিরোধ কমিয়ে আনা| অধ্যাপক সুকুমার সেন মনে করেন, "শ্রী চৈতন্যদেবের আন্দোলন একটা সমাজ বিপ্লবের সূচনা করেছিল"| রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন যে, "শ্রী চৈতন্যের আন্দোলন সাংস্কৃতিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন এনেছিল| হিন্দু সমাজের যে সহনশীল চরিত্র তার মূলে ভক্তিবাদের প্রভাব কাজ করেছিল"|


তথ্যসূত্র

1.Shahabuddin Iraqi, "Bhakti Movement in Medieval India: Social & Political Perspectives"
2. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ী, "মধ্যকালীন ভারত"
3. V D Mahajan, "History of Medieval India"
4. Teiji Sakata and Katsuyuki Ida Iwao Shima, "The Historical Development of The Bhakti Movement in India Theory and Practice"
5.Krishna Sharma, "Bhakti and Bhakti Movement: A New Perspective"

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|

                   ..................................

Your Reaction ?

Previous
Next Post »