সাহিত্য ও শিল্পের উপর রেনেসাঁর প্রভাব

রেনেসাঁ বা নবজাগরণের মুক্ত হাওয়া জীবনের যেদিকগুলিকে সর্বাধিক আন্দোলিত করেছিল, তাদের মধ্যে উন্নত হল সাহিত্য ও শিল্প| বস্তুত পঞ্চদশ শতকের পরবর্তীকালে আধুনিক সাহিত্য ও শিল্পরসের উদ্ভব ঘটে| আবার নবজাগরণের ফলে জন্ম নেই মানবতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ| এর উপরেই ভিত্তি করেই সাহিত্য বিষয় বস্তুতে পরিণত হয়|

গীর্জার নিয়ন্ত্রণমুক্ত ধর্মীয় বিশ্বাসে না দেখা, না জানা বিষয় বস্তুকে পরিত্যাগ করে সাহিত্য ও শিল্পরস হয়ে উঠে প্রকৃত অর্থেই জীবনমুখী| "শিল্পের জন্য শিল্প"- এই বোধ শিল্পকলার জগতে নিয়ে আসে অভূতপূর্ব বৈচিত্র ও প্রাণ স্পন্দন|


সাহিত্য-ও-শিল্পের-উপর-রেনেসাঁস-এর-প্রভাব

রেনেসাঁস মূর্তি



রেনেসাঁ সাহিত্য আন্দোলন

পঞ্চদশ শতকের শেষ এবং ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধ ছিল ইউরোপের সংস্কৃতির যুগসন্ধিক্ষণ| এই যুগসন্ধিক্ষণে ইউরোপের সাহিত্যিকরা একই সঙ্গে ল্যাটিন ও মাতৃভাষা চর্চা করেন| ধ্রুপদী গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্যের আঙ্গিক শৈলী অনুভূতি ও সৌন্দর্য বোধ রেনেসাঁস সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছিল| এই যুগেই সাহিত্যিক রচনা করেন কবিতা, নাটক ও গদ্য সাহিত্য| এর সঙ্গে ছিল রোমান মহাকাব্য ও চারণ কবিদের গাঁথা|


নবজাগরণের যুগে মানবতাবাদী(আরো পড়ুন) তথা জীবনমুখী সাহিত্য চর্চার প্রধান মাধ্যম ছিল গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষা| নবজাগরণের মাতৃভূমি ইতালির মানবতাবাদী সাহিত্যিকদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন দুরান্তে দেইলি আলিগিয়েরি বা দান্তে| তিনি ইতালি ভাষায় "লা ভিতা", "ইল কনভিভিও", "দ্যা ডিভাইন কমেডি" প্রভৃতি রচনা করে কাব্য চর্চাকে নতুন গতি প্রদান করেন|

আর এক সাহিত্যিক পেত্রার্ক(Francesco petrarca) "লে রাইম" ও "ট্রাম্পাস" গ্রন্থ দ্বয়ের মধ্য দিয়ে জীবনের প্রেম, প্রীতি ও ভালোবাসাকে তুলে ধরেছিলেন| তাঁর জীবনমুখী সাহিত্য রচনার পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক ডুরান্ট(W. Durant) বলেছেন, "পেত্রার্ক ছিলেন প্রথম মানবতাবাদী শিক্ষাবিদ, যিনি মানুষের জীবনকে ভিত্তি করে সাহিত্য সৃষ্টির অধিকার প্রথম প্রচার করেন"|

পেত্রার্ক এর সমসাময়িক  বোকাচিও(Boccaccio) লিখেছেন "ডেকামেরন", আর ম্যাকিয়াভেলি রচনা করেছিলেন "দ্য প্রিন্স" ও "ডিসকোর্সেস"| এছাড়াও রেনেসাঁ যুগের ইতালির কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনজন বিখ্যাত হলেন লুইগি পুলসিলোকোভিকো এবং এরিযোস্টো|

ইটালির উর্বর ভূমিতে সাহিত্য নবজীবন লাভ করে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে| পরে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তেও অনুভূত হয় তার প্রাণ স্পন্দন| আর জার্মান নাট্যকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান নেই রোজেন প্লুট, হান্স, ব্রান্ট প্রমুখ| তবে ইংল্যান্ডের ইরাসমাস হলেন খুবই পরিচিত নাম| তাই এই সময় গাওয়ারচসার ছাড়া বড় কবি ছিলো না| গদ্য সাহিত্যে কিন্তু তেমন উন্নত হয়নি| তবে জনসন এবং শেক্সপিয়ার নাটক লিখে মানুষের দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছেন| তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ইতালির রেনেসাঁসের হাওয়া জার্মানি, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের উপর পড়লেও পশ্চিম ইউরোপের বাইরে এর প্রভাব পড়েনি|

মানুষ, ঈশ্বর সৃষ্টির নিয়ে চিন্তাভাবনা সাহিত্যের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়| আবার রেনেসাঁ সাহিত্য ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে উৎসাহ দিয়েছিল এবং সবাইকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে হয়| তাছাড়া রেনেসাঁ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো "রোমান্টিক প্রেমের ধারণা"| আর রেনেসাঁ সাহিত্যই রাজনীতি, অর্থনীতি, ভৌগোলিক আবিষ্কার ও নব জাতীয়তাবাদ, বুর্জোয়াদের উত্থান ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় এবং এইভাবে জন্ম হয় আধুনিক সাহিত্যের|



রেনেসাঁ শিল্প আন্দোলন

সাহিত্যের মতো শিল্পেও নবজাগরণের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়| মধ্যযুগের শিল্পকলার গতি সাবলীল ছিল না, ছিল গতানুগতিক| কিন্তু নবজাগরণ সেই গতানুগতিককে ভেঙে দিয়ে নিয়ে আসে জীবনমুখী শিল্পচর্চা এবং নিষ্প্রাণ শিল্পচর্চা হয় প্রাণস্বচ্ছল| এর সাথে নর-নারীর আশা-আকাঙ্ক্ষার বিভিন্ন রূপ, জীব-জন্তু, নদী-পাহাড় ইত্যাদি উপর ভিত্তি করে শুরু হয় নতুন জীবনের ধারনা এবং শিল্পের প্রস্ফুটিত হয় চলমান বস্তুর জীবন ও জগতের ছবি|

সাহিত্যের মতো শিল্পেও নবজাগরণের পথ প্রদর্শক ছিল ইতালির ফ্লোরেন্স নগরী| ফ্লোরেন্সের চিত্রবিদ জিওটি-কে চিত্রাঙ্কনে নবজাগরণের আদি রূপকার বলা হয়| ফ্লোরেন্সের বাত্তিসেলী জীবনমুখী চিত্রাঙ্কন করে চিত্রাঙ্কনের ইতিহাসে নবযুগের প্রবর্তন করেন| স্থাপত্যবিদ ব্রামানটি রোমের সেন্ট পিটার গির্জায় তার আধুনিক স্থাপত্য ভাস্কর্য ফুটিয়ে তোলেন| টাইটিয়ান চিত্রায়িত করেছিলেন "The Three Ages of Man".

সাহিত্য-ও-শিল্পের-উপর-রেনেসাঁস-এর-প্রভাব

মোনালিসা

সাহিত্য-ও-শিল্পের-উপর-রেনেসাঁস-এর-প্রভাব

দ্য লাস্ট সাপার বা শেষ নৈশভোজ




নবজাগ্রত সংস্কৃতির স্রষ্টা এবং শিল্প ও চিত্রকলার প্রধান চরিত্র হলো লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো বা মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল বা রাফায়েল্লো| ভিঞ্চির দুটি কালজয়ী সৃষ্টি হল "মোনালিসা" এবং "দ্য লাস্ট সাপার" বা "শেষ নৈশভোজ" এবং তাঁর ছবিতে কোন মধ্যযুগীয় বাহুল্য নেই| চিত্রায়িত চরিত্রগুলির প্রতিকৃতি এবং ব্যাক্তিত্ব এখানে শিল্পের মূল বিষয়বস্তু ছিল|

সাহিত্য-ও-শিল্পের-উপর-রেনেসাঁস-এর-প্রভাব

The Creation of Adam



যাকে আমরা "High Renaissance Art" বলি তার দ্বিতীয় আকর্ষণীয় ব্যক্তি হলেন মাইকেলেঞ্জেলো| সিসটাইন চ্যাপেলের "The Creation of Adam" নামে যে দেওয়াল চিত্রটি তিনি এঁকেছিলেন সেখানে মানুষের নগ্ন প্রকৃতির মধ্যে মানুষের জীবন শক্তিকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন| আবার ধর্মীয় সংঘাতের ভিত্তিতে তিনি চিত্রায়িত করেছিলেন "শেষ বিচার"(The Last Judgment)|

এই যুগে আর এক অন্যতম এবং স্মরণীয় শিল্পী ছিলেন ইতালির রাফায়েল| তাঁর আঁকা যীশুখ্রীষ্টের মাতা "ম্যাডোনা" চিত্রটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রাঙ্কন হিসেবে বিবেচিত হয়|


ইতালির মানবতাবাদী(আরো পড়ুন) যুব চেতনার স্ফূরন শুধুমাত্র ইতালিতেই ঘটেছিল, এমনটা ভাবলে খুব ভুল হবে| এই যুগ ভাবনার সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপের যোগাযোগ ঘটে| এই সময় ইতালিতে যারা বইয়ের ব্যবসা করতে আসতেন এবং বিদ্যার্থীরা পড়াশোনা করতে আসতেন, তারা দেশে ফিরে গিয়ে পশ্চিম ইউরোপের নতুন চিন্তা-ভাবনার সংযোগ ঘটিয়ে ছিলেন| ঐতিহাসিক Jacob Burckhardt তাঁর গ্রন্থ "The Civilization of the Renaissance in Italy" তে দেখিয়েছেন কীভাবে এই ইতালির সাংস্কৃতিক জীবনকে বিদেশিদের অনেকেই একটি উচ্চতর সভ্যতার নির্ণয় রূপে প্রত্যক্ষ করেছিলেন|


উপসংহার 

তবে পরিশেষে একথা নিঃসন্দেহে আমরা বলতে পারি যে, রেনেসাঁ শিল্প হল মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ অবদান| স্থাপত্য-ভাস্কর্য ও চিত্রকলার শিল্পীরা পরিপূর্ণ জীবনের জয়গান গেয়েছেন| তবে শিল্পীরা শুকনো বাস্তবকে ধরতে চাননি, তারা বাস্তবকে তাদের আনন্দ ও সৌন্দর্যবোধ অধরা মাধুরীকে ধরেছে| রেনেসাঁ সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সার্থকতা লাভ করেছে এবং সার্থক হয়েছে তাদের এই কালজয়ী চিত্রকলা ও সাহিত্য|


তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Jacob Burckhardt, "The Civilization of the Renaissance in Italy".
  3. Roberta J. M., "The Biography of the Object in Late Medieval and Renaissance Italy".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »

    2 Comments

    Click here for Comments
    Unknown
    admin
    15 January 2019 at 11:27 ×

    Really,
    My all problems solved for this post..
    Thank you so much sir

    Reply
    avatar
    Nabarun Saha
    admin
    15 January 2019 at 23:36 ×

    Welcome to "Alive Histories".

    Thank you so much to Read our short Post..

    Reply
    avatar