Saturday, 5 January 2019

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলন

দক্ষিণ আফ্রিকা ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পায় 1934 সালে| ইংরেজরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে স্বাধীন দেশের মর্যাদা দিলেও তারা সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেই|

সেই সময় শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার 17 শতাংশ| সর্বাপেক্ষা বৃহৎ গোষ্ঠী ছিল বান্টু, এরা ছিল মোট জনসংখ্যার 60 শতাংশ| জনসংখ্যার বাকি অংশ ছিল শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায়দের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা জনগোষ্ঠী এবং নাটান প্রদেশে বসবাসকারী ভারতীয়| দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতকায়রা ছিল Apartheid বা আপার্টহাইট বা বর্ণবাদী নীতির অন্ধ সমর্থক|


দক্ষিণ-আফ্রিকার-বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী-আন্দোলন

দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান



বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আইন

1948 সালে নির্বাচনে ডি. এফ. মালন(D. F. Malan) এর নেতৃত্বে "ন্যাশনাল পার্টি" দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়|

মালন এর কর্মসূচিতে শ্বেতকায়দের অভিভাবকত্বে "আপার্টহাইট"  বা  "বর্ণবাদী নীতি" প্রয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়| বর্ণবাদের ভিত্তিতে অনেক বৈষম্যমূলক আইন প্রণীত হয়, যেমন- population registration act, Group Areas Act প্রভৃতি|


শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায়দের জন্য পৃথক পরিষেবা

বর্ণবাদ নীতির ভিত্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বস্তুত দুটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়| শ্বেতকায়দের জন্য একটি এলাকা এবং কৃষ্ণকায়দের জন্য একটি অন্য এলাকার বাছাই করা হয়েছিল| শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায়দের জন্য পৃথক শিক্ষায়তন, পরিবহন, গির্জা, হোটেল, খেলার মাঠ, চিকিৎসাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছিল| এমনকি শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায়দের জন্য স্বতন্ত্র বেতনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল|

আইন, শাসন বিচারের ক্ষেত্রেও পরিচয় জ্ঞাপক একটি পরিচয় পত্র দেওয়া হয়| সরকারি অনুমতি পত্র ছাড়া কোন কৃষ্ণকায় শ্বেতকায়ের এলাকায় যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়| এমনকি শ্বেতকায় ও অশ্বেতকায়দের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়| কৃষ্ণাঙ্গরা সমস্ত রকম রাজনৈতিক অধিকার হারায় এবং কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা ধর্মঘটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়|


হেনড্রিক ভরবের্ড

দক্ষিণ-আফ্রিকার-বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী-আন্দোলন

হেনড্রিক ভরবের্ড



বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক নীতি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হেনড্রিক ভরবের্ড 1958 থেকে 1966 সালে সময়কালের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করেন| পূর্বে অশ্বেতকায়দের জন্য যে নামে মাত্র ভোটাধিকার ছিল, তা আরো সংকোচন করা হয়| Apartheid বা  বর্ণবাদী নীতি এভাবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়|

1960 সালে 21 শে র্মাচ শার্পভিলে কৃষ্ণকায়দের প্রতিবাদ আন্দোলনের উপর ভরবের্ড-এর বাহিনীর নৃশংস আক্রমণের ফলে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয় এবং এই ঘটনাকে বিশ্ব জনসমাজ তীব্র ধিক্কার জানাই|


বি জে ভরস্টার

দক্ষিণ-আফ্রিকার-বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী-আন্দোলন

বি জে ভরস্টার



কিন্তু এই ঘটনাকে কর্ণপাত না করে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বি জে ভরস্টার কৃষ্ণকায়দের জন্য পৃথক উপজাতীয় অঞ্চল বা বান্টুস্তান গঠনের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেন|

যেসব অঞ্চল নিয়ে এই বান্টুস্তান গঠিত হয়, তার আয়তন ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার মোট আয়তনের 13 শতাংশ মাত্র| এই অঞ্চলের তিন চতুথাংশ জনসংখ্যাকে জোর করে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়|


বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন

1970 এবং 1974 সালের নির্বাচনে আবার ন্যাশনাল পার্টি জয়ী হয়| এরফলে বর্ণবাদী নীতি আগের মতই অব্যাহত থাকে| কিন্তু সত্তরের দশকে অ্যাঙ্গোলা মোজাম্বিককে স্বাধীনতা আন্দোলনের সাফল্যের সূচনা দক্ষিণ আফ্রিকার বুকে পরিবর্তনে ঢেউ তুলে|

জোহানেসবার্গ, প্রিটোরিয়া এবং কেপটাউন অঞ্চলে বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে ওঠে| বর্ণবাদী সরকার কঠোর হাতে দমন পীড়ন গ্রেফতার ও গুলি চালনার মাধ্যমে আন্দোলনের তীব্রতা স্তব্ধ করার চেষ্টা চালায়| কিন্তু 1998 সালে সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের ফলে বাধ্য হয়ে কিছু বর্ণবৈষম্যমূলক আইন বাতিল করে|


1990 সালে ফ্রেদেরিক উইলেম ডি ক্লার্ক 27 বছর ধরে কারারুদ্ধ আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দেন এবং population registration act, Group Areas Act প্রভৃতি আইন বাতিল করা হয়| 1993 সালে কৃষ্ণাঙ্গ এবং  শ্বেতাঙ্গ 21টি রাজনৈতিক দল বর্ণবাদের অবসান এবং সকলের জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি নতুন সংবিধানের প্রতি অঙ্গীকার ঘোষণা করে|


উপসংহার

1994 সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম বর্ণবাদহীন নির্বাচনে "আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস" বিপুল সংখ্যাধিক্যে বিজয়ী হয় এবং জাতীয় সভা কর্তৃক নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন| তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে শ্বেতাঙ্গ শাসকদের নির্মম উৎপীড়ন ও নির্যাতনের কালরাত্রির দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে জন্ম হয় এক নতুন জাতির|


তথ্যসূত্র

  1. Michael Morris, "Apartheid: The History of Apartheid: Race vs. Reason - South Africa from 1948 - 1994".
  2. Oliver S. Lawrence, "Racism: Stories from South Africa".
  3. Nelson Mandela, "Long Walk To Freedom".
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................


    Thank you so much for reading the full post. Hope you like this post. If you have any questions about this post, then please let us know via the comments below and definitely share the post for help others know.

    Related Posts

    0 Comments: