জাপানে সামন্তবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী ছিল

খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে জাপানে একটি নতুন ধরনের সামন্ত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল| তাইহো আইন-বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থায় জমির উপর একচেটিয়া মালিকানা কায়েম করেছিল শাসকশ্রেণী|

শাসক এবং কৃষকের মধ্যবর্তী স্তরে ছিল মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী| এই মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী কিছু দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে শাসকের কাছ থেকে জমি পেয়েছিল| বন্টিত জমিকে বলা হত "শয়েন জোত"| শয়েন ভূস্বামীরা কৃষকের কাছ থেকে কর আদায় করত ও ভূমিহীন কৃষকদের বেগার শ্রম দিতে বাধ্য করতো|

জাপানে-সামন্তবাদের-বিশেষ-বৈশিষ্ট্য-কী-ছিল

জাপানের অবস্থান



দ্বাদশ শতকে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে| শোগুনতন্ত্র জাপানের সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর জাপানে সামন্ত ব্যবস্থা আরও সংযত হয়| শোগুনতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল ডাইমিয়োদের হাতে এবং এরা ছিল বৃহৎ ভুস্বামী শ্রেণি ও নিষ্কর জমির মালিক|

জমির আয়তন ও সম্পত্তির ভিত্তিতে ডাইমিয়োদের মধ্যে কয়েকটি স্তর সৃষ্টি হয়েছিল| যাদের জমির আয়তন একটি প্রদেশের মত ছিল, তাদের বলা হতো প্রদেশ পাল| যে সমস্ত ডাইমিয়োরা দুর্গ রাখতেন, তাদের পরিচয় ছিল দূর্গেশ্বর এবং সাধারণ ডাইমিয়োকে বলা হতো রিয়োসু| প্রদেশ পালের সংখ্যা ছিল 20, দূর্গেশ্বরের সংখ্যা ছিল 140, আর সাধারণ ডাইমিয়োদের সংখ্যা ছিল 110


ডাইমিয়োরা নিজস্ব জমিদারি এলাকায় স্বায়ত্ত শাসন ভোগ করতেন, এটা অনেকটা "A system of privet goverment" এর মত| জমিদারিতে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অপরাধীদের বিচার করা, কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায়, বেগার শ্রম আদায় ও নিজস্ব সৈন্য বাহিনী গঠন-  এই সবই ছিল ডাইমিয়োদের অধিকার|

অধিকারগুলি ভোগ করার বিনিময়ে ডাইমিয়োরা শোগুনের প্রতি আনুগত্য জানাতে বাধ্য ছিলেন| শোগুনের সেবা করতেন এই ডাইমিয়োরাই এবং এই পদ ধীরে ধীরে বংশানুক্রমিক হয়ে যাওয়ায় এদের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল|

সামুরাই যোদ্ধারা ডাইমিয়োদের অধীনে ভাড়াটে কর্মচারি হিসাবে কাজ করতো| ভূস্বামী ডাইমিয়োর প্রভুর নিকট সামরিক আনুগত্যের শপথ নিতে সামুরাই যোদ্ধারা, এর বিনিময়ে তারা জায়গীর পেতেন| প্রাপ্ত জায়গীরের উপর প্রশাসনিক ক্ষমতা ভোগ করতো সামুরাইরা| কখনো কখনো তারা একটা গ্রাম জায়গীর হিসাব পেতেন| জাপানে সামন্ততন্ত্রের মূলত দুটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়-
  1. জায়গীরকে কেন্দ্র করে সামন্ত প্রভুর সঙ্গে অধীনস্থ সামুরাইদের সম্পর্ক| 
  2. ভূস্বামী ও তার অধীনস্থ সামন্ত কর্মচারীদের মধ্যে আত্মিক বন্ধন|
জাপানে প্রচলিত সামন্ত ব্যবস্থায় দুই ধরনের কৃষকের অস্তিত্ব দেখা যায়| একদল ছিল ছোট ছোট ভূখণ্ডের মালিক, এদের বলা হত "হাইয়া কুশো"| হাইয়া কুশো খাজনা সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সামন্তদের কাছে জমা দিতে বাধ্য ছিলেন, এরা চাষের জন্য খেতমজুর নিযুক্ত করতেন|


এদের পরের স্তরে স্থান ছিল ভূমিহীন কৃষকদের, যারা প্রভুর জমিতে চাষ করতেন| একেবারে নিম্নস্তরে ছিল খেতমজুর ও গেনিন| গেনিনরা বেগার শ্রম দিতে বাধ্য ছিলেন| বড় ভূস্বামী, ডাইমিয়ো, সামুরাই ও হাইয়া কুশোরা নিপীড়নের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত খাজনা আদায় করতেন| এই ধরনের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা জাপানে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল|


তথ্যসূত্র

  1. ড. হরপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, "জাপানের ইতিহাস"
  2. R. H. P. Mason, "A History of Japan".
  3. Kenneth Henshall, "A History of Japan: From Stone Age to Superpower".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. মেইজি যুগে জাপানে প্রবর্তিত নতুন ভূমি ব্যবস্থা (আরো পড়ুন)
  2. মেইজি পুনর্গঠন এর প্রকৃতি কিরূপ ছিল (আরও পড়ুন)
  3. জাপানের ইতিহাসে ডাইমিয়ো এবং সামুরাই বলতে কি বুঝায় (আরও পড়ুন)
  4. মেইজি যুগের মুদ্রা ব্যবস্থার অতি সংক্ষিপ্ত আলোচনা (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................


    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »