ষোড়শ শতকের ইউরোপের মানচিত্র অঙ্কনের বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা

মধ্যযুগের ইউরোপীয়দের ধারণায় পৃথিবী ছিল চারটি মহাদেশের সমাহার, যথা- ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং এক অপরিচিত এক বিশাল অপরিচিত ভূখণ্ড "টেরা ইনকগনিটো"-দক্ষিণ গোলার্ধের কোথাও যার অবস্থান|

এই পর্বে রচিত মানচিত্রগুলিতে স্থলভাগের আধিক্যের পাশে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরকে অতি সংকীর্ণ ভাবে দেখানো হয়েছে এবং প্রশান্ত মহাসাগর ছিল অনুপস্থিত| পৃথিবীর প্রকৃত চেহারা সম্পর্কে ইউরোপীয়দের এই অজ্ঞতার জন্য দায়ী ছিল মানচিত্র নির্মাতাদের ভৌগলিক জ্ঞানের অভাব এবং খ্রিস্টান ঐতিহ্য|


ষোড়শ-শতকের-ইউরোপের-মানচিত্র-অঙ্কনের-বিষয়ে-সংক্ষিপ্ত-আলোচনা
পৃথিবীর মানচিত্র



টলেমির মানচিত্র

প্রাচীন যুগে গ্রিক ও রোমানদের আঁকা মানচিত্রগুলি ছিল অনেক বেশি যথাযথ| এগুলির মধ্যে টলেমির মানচিত্রটি 1882 খ্রিস্টাব্দে "হাইফিজেসিক" নামে প্রকাশিত হয়|

টলেমির রেখে যাওয়া মানচিত্রে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ভুলভাবে অঙ্কিত না হলেও বিষুবরেখা সঠিকভাবেই চিত্রিত হয়েছিল|


উত্তর ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন এবং মহাদেশ থেকে আলাদা করে এঁকে ছিলেন টলেমি| স্পেনের অবস্থান ও আয়তন নির্ভুল না হলেও ভূমধ্য সাগরের আয়তন, গ্রিস ও এশিয়া মাইনরের অবস্থান ছিল মোটামুটি নির্ভুল|

টলেমির মানচিত্রে আফ্রিকা অতি স্ফীত এবং তার পূর্বাংশ মিশে গেছে টেরা ইনকগনিটোতে|



ফ্রা মরো এবং আল-ইদ্রিসি-র মানচিত্র

ষোড়শ-শতকের-ইউরোপের-মানচিত্র-অঙ্কনের-বিষয়ে-সংক্ষিপ্ত-আলোচনা
আল-ইদ্রিসি-র মানচিত্র
Source- wikipedia(check here)
License- creative commons



নিক্কোলো দি কন্তির উপর নির্ভর করে 1459 খ্রিস্টাব্দে ফ্রা মরো তার "প্লানিস্ফিয়ার" নামে রচনায় টেরা ইনকগনিটোর ধারণা স্পষ্টতর করার সাথে সাথে এশিয়ার দিকে সমুদ্র বিস্তার সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন তার মানচিত্রে|

1456 খ্রিস্টাব্দের আল-ইদ্রিসি যে মানচিত্রটি রচনা করেছিলেন তাতে পৃথিবীর উত্তর অংশের তুলনায় দক্ষিণ অংশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়| 1588 খ্রিস্টাব্দে "কসমোগ্রাফিয়া" নামে মানচিত্র ভূমন্ডলের যে পরিচয় ছাপা হয়েছিল, সম্ভবত সেটাই ছিল প্রথম মুদ্রিত মানচিত্র|



আলবার্তো ক্যানটিনো মানচিত্র

আলবার্তো ক্যানটিনো অঙ্কিত মানচিত্র পৃথিবীর স্থলভাগ এবং বিপুল জলরাশি সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে অনেকটাই স্পষ্ট করে দিয়েছিল|

1502 খ্রিস্টাব্দে অঙ্কিত এই মানচিত্রটি "ক্যানটিনো মানচিত্র" নামে পরিচিত| মানচিত্র অঙ্কনের প্রেরণ ছিল স্পেনীয় ও পর্তুগীজদের অত্যাশ্চর্য সামুদ্রিক অভিযানগুলির বিবরণ| ইহুদিরা আবার ইউরোপীয় এবং আরবীয় পর্যটকের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন এলাকার কিছু খন্ডিত মানচিত্র অংকন করেন|



হ্যাকলুটের মানচিত্র

তবে ষোড়শ শতকের শেষদিকে সমস্ত পৃথিবীর চেহারাটা স্পষ্ট হতে থাকে এবং এই পর্যায়ে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন ইংরেজ যাজক ও ভূগোল বিশারদ রিচার্ড হ্যাকলুট|

পৃথিবীর স্থলভাগের মোটামুটি রূপরেখা তৈরি হলেও উপস্থাপিত দেশগুলির ভেতরে কোনো বিবরণ মানচিত্রগুলিতে পাওয়া যায় না| এক্ষেত্রে স্পেনের নৌ বিভাগ থেকে যে মানচিত্র তৈরি হয়েছিল, তাতে ইংল্যান্ড থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ এবং লাব্রেডর থেকে ম্যাগেলন প্রণালী পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূল এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের নির্ভুল চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল| যদিও অনুল্লেখিত ছিল উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ|


গারহার্ডাস এবং ব্লেরুর মানচিত্র

ষোড়শ শতকে মানচিত্রগুলিকে বিভিন্ন দেশের বক্ররেখাগুলিকে অস্বাভাবিকভাবে প্রলম্বিত করা হতো| এই সময়ের মানচিত্র ত্রুটি দূর করার জন্য বিশিষ্ট ভূগোল বিশারদ ও মানচিত্র নির্মাতা গারহার্ডাস সচেষ্ট হন|

এছাড়া মানচিত্র বিশারদ ব্লেরু উত্তর ও দক্ষিণতম ভূভাগকে মানচিত্রের বাইরে প্রসারিত করে নিরক্ষরেখা বরাবর এলাকায় পরিপ্রেক্ষিতে চিহ্নিত করেন| এই সময় ব্লেরুর তৈরি মানচিত্র সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হতো|


1598 খ্রিস্টাব্দে গারহার্ডাস যে "ম্যাপ প্রোজেকসন" উপস্থাপিত করেন, তা সমুদ্র যাত্রায় পরম সহায়ক হয়ে ওঠে| এই মানচিত্রে রেখাগুলিকে সমান্তরালভাবে আঁকা হয়েছে এবং অক্ষরেখাগুলিকে চিহ্নিত হয়ে বিষুবরেখা পর্যন্ত যত দূর এগিয়েছে, কারন এই মানচিত্রে অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমা রেখাগুলি অনেক নিখুঁতভাবে আঁকা| এই ধরনের মানচিত্র ও কম্পাসের সাহায্যে তৈরি হয়েছিল "পোর্টোলান" নামক নির্দেশিকাগুলি|


উপরিউক্ত মানচিত্র কি ইউরোপীয়দের আবিষ্কারর ফল ছিল

ষোড়শ-শতকের-ইউরোপের-মানচিত্র-অঙ্কনের-বিষয়ে-সংক্ষিপ্ত-আলোচনা


ষোড়শ শতকে অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিপূর্ণভাবে পৃথিবীর মানচিত্র অঙ্কন সম্ভব হয়নি| এর জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল 1780 খ্রিস্টাব্দ, তবে 1480 থেকে 1780 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপের নাবিকরা এবং মানচিত্র বিদরা পৃথিবী যে মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, তাতে ষোড়শ শতকের প্রচেষ্টা ছিল সবচেয়ে মূল্যবান|

কল্পনা নির্ভর মানচিত্র থেকে শুরু করে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ অঙ্কনের পদ্ধতি আবিষ্কৃত হতেই মানচিত্রের নতুন জগৎ উন্মোচিত হয় এই ষোড়শ শতকেই|

প্রাচীন যুগ থেকেই টলেমির মানচিত্র সংশোধনের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো| তবে টলেমির মানচিত্র সংশোধনের বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল পর্তুগিজ নাবিকরা| কারণ তাদের অভিযানের ফলে মেনে নিয়েছিল যে, তাদের ধারণা সত্য নয়|



ভৌগোলিক আবিষ্কারের সহায়ক যন্ত্রপাতি

ষোড়শ-শতকের-ইউরোপের-মানচিত্র-অঙ্কনের-বিষয়ে-সংক্ষিপ্ত-আলোচনা
কম্পাস


সমুদ্র যাত্রার শুরুর সাথে সাথেই নতুন পথ জানবার প্রচেষ্টায় আবিষ্কৃত হয় কম্পাস, অষ্টোল্যাব| ইতিমধ্যে গ্লোব ও তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় সংক্রান্ত নানা কাজে মানচিত্র নির্মাণের সাহায্য করে|


ভারত ও আমেরিকা আবিষ্কারের কথা

ষোড়শ-শতকের-ইউরোপের-মানচিত্র-অঙ্কনের-বিষয়ে-সংক্ষিপ্ত-আলোচনা
বর্তমানে ভারতের মানচিত্র


বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শুরু হয় এশিয়ার দিকে সমুদ্র অভিযান| ভারতের উপকূলের দিকে পৌঁছানোর পর ভারত মহাসাগরের জল আবিষ্কারের পর থেকে এবং কলম্বাস কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কারের পর মানচিত্র অঙ্কন আরো সহজ হয়|



উপসংহার 

অতীতের কিছু ভূগোল বিশারদদের রেখে যাওয়া কিছু অস্পষ্ট বিবরণের উপর নির্ভর করে যে দুঃসাহসিক নাবিকেরা অজানা পথ ধরে পাড়ি দিয়ে অপরিচিত দেশে পৌঁছে যেতেন, সেই বিবরণের সূত্র ধরে পৃথিবীর আসল চেহারাটা মানুষের কাছে ফুটে উঠে| 

তাই বলা যায় যে, সামরিক অভিযান ও ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলেই মানচিত্র অঙ্কন ক্রমশ নির্ভরযোগ্য হতে শুরু করে|


তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. George Holmes, "The Oxford History of Medieval Europe".
  3. C. Warren Hollister, "Medieval Europe: A Short History".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »