মুঘল যুগের বিভিন্ন বাণিজ্য কেন্দ্র এবং এর গুরুত্ব

মুঘল যুগে অর্থাৎ ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতের অর্থনীতি, একদিকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য এবং অন্যদিকে গ্রামীণ কৃষি ও শিল্পকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছিল| এর সঙ্গে ছিল অবশ্যই কারিগরি শিল্প| 

অর্থনীতির এই কাঠামো কৃষি ও শিল্প পণ্যের বিনিময়কে অপরিহার্য করে তোলে| আর এই বিনিময়ের প্রদান কেন্দ্র ছিল বাজার| এই বাজারের গুরুত্ব কম ছিল না|

মুঘল যুগে অভ্যন্তরীণ বাজারের দুটি রূপ দেখা যায়, একটি ছিল গ্রামীণ বাজার থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করা এবং অন্যটি ছিল গ্রামীণ বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা, যেমন- তুলো|

মুঘল-যুগের-বিভিন্ন-বাণিজ্য-কেন্দ্র-এবং-এর-গুরুত্ব
বাজার



মুঘল ভারতের বাজারে কয়েকটি স্তরভেদ দেখা যায়| অধ্যাপক তপন রায় চৌধুরী "Cambridge economics history"তে ভারতের বাজারগুলিতে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছেন, যথা-
  1. স্থানীয় বাজার মান্ডি 
  2. আন্তর্জাতিক বাজারে জন্য বন্দর ও শহরের বড় বাজার
  3. ভারতের সাময়িক মেলা 
  4. গ্রামের বিচ্ছিন্ন বাজার
গ্রামীণ বাজার প্রধানত গ্রামের পণ্য ও খাদ্যশস্য নিয়ে কাছাকাছি বসত, সম্ভবত সপ্তাহে এক বা দুই দিন| বাংলাদেশে এগুলিকে হাট বলা হত|

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবন বতুতা এবং ষোড়শ শতাব্দীতে অন্যান্য বিদেশি পর্যটকরা এরকম বহু বাজার দেখেছেন| গ্রামের কাঁচামাল শহরতলীতে কারিগরের কাছে পণ্যের রপ্তানিত হয়ে শহরের প্রান্তে হাটে বিক্রি হতো| গ্রামের দৈনন্দিন বাজারের মতো শহরের বিভিন্ন মহাল্লাতেও বাজার ছিল| বিভিন্ন রাস্তায় বিভক্ত এইসব বাজার এক এক রাস্তায় বিশেষ বিশেষ পণ্য বিক্রি করতো|

মুঘল-যুগের-বিভিন্ন-বাণিজ্য-কেন্দ্র-এবং-এর-গুরুত্ব

                    মুঘল সাম্রাজ্যের মানচিত্র

                Author- Santosh.mbahrm
               Date- 26 September 2015
             Source- wikipedia (check here)
 License- GNU Free Documentation License



মুঘল যুগে ভারতের বিভিন্ন স্থানে নানা উৎসব উপলক্ষে মেলা বসতো| মেলায় মানুষ জিনিসপত্র কিনতো ও বিক্রি করতো| মেলাগুলিতে ব্যবসায়ীরা পণ্য কেনাবেচা করতে সমবেত হতো| এই প্রসঙ্গে কার্তিক মাসে পূর্ণিমায় সঙ্গমস্থলে শোন পুরের মেলা উল্লেখযোগ্য, জন মার্শাল এই মেলার চিত্তাকর্ষক বিবরণ দিয়েছেন|

পৌর এলাকার বাজারে গ্রামীণ ও পৌর উভয় জিনিস পাওয়া যেত| পার্শ্ববর্তী শিল্প-বাণিজ্য কেন্দ্রে বর্ধিত জনসংখ্যার কারণে বড় বড় বাজার গড়ে উঠেছিল|ভারতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও বহিঃবাণিজ্যে চাহিদা অনুযায়ী এসব বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করা হতো|

খুচরা বিক্রির জন্য সাধারণ ছোট ছোট বাজার এবং পাইকারি বিক্রির জন্য মান্ডি বা গঞ্জ গড়ে উঠত| এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পণ্যের বাজার ছিল, যেমন- বিহার ছাপরায় ছিল সুরার বাজার, ঢাকা ছিল মসলিনের বাজার ইত্যাদি| এই সব বিশেষ পণ্য কেনার জন্য বণিকরা এসব বাজারে এসে মিলিত হতো|

দিল্লি, আগ্রা, মুলতান, লাহোর, পাটনা, বেনারস ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র এবং অন্তর্দেশীয় বাজার| এই শহরগুলোতে বড় বড় বাজার ছিল| এইসব বাজার থেকে বিদেশি ও দেশী বণিকরা পণ্য কিনে বিদেশে পাঠাতো|

মুঘল যুগে ভৌগোলিক অথবা রাজনৈতিক কারণে আন্ত-আঞ্চলিক যুক্ত পথের উপর অথবা প্রশাসনিক কেন্দ্রের কারণেও সমুদ্র বন্দর অপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে বিশাল বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠতো|

মুঘল-যুগের-বিভিন্ন-বাণিজ্য-কেন্দ্র-এবং-এর-গুরুত্ব



সমুদ্র বন্দরগুলি অন্তর্দেশীয় ও বহির্বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত| ভারতের শহর ও বন্দরগুলিতে বড় বড় বাজার ছিল| এই যুগে বন্দর বাজার হিসাবে সুরাট, মসুলিপটম ও হুগলি বিখ্যাত ছিল| এসব বন্দর বাজার থেকে বণিকরা পণ্য সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাতো|

অঞ্চল ভিত্তিক বাজার প্রতিষ্ঠার ফলে দেখা যায় বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্য এক জায়গায় মজুত হচ্ছে| যেমন- উত্তর ভারতের দিল্লি, আগ্রা ও জৌনপুরের বাজারে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পণ্য এসে মজুত হতো| যমুনা দিয়ে যে সমস্ত পণ্যদ্রব্য আসত, সেগুলি আগ্রার সেকেন্দ্রা বাজারে জড়ো হতো|

বাংলার গৌড়, রাজমহল, ঢাকা, কাশিমবাজার এবং হুগলিতে গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল| মালদহ জেলার সিল্ক বস্ত্র ঢাকা, রাজমহল ও মুর্শিদাবাদের সরবরাহ করা হতো| সপ্তদশ শতকের বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ থেকে সুরাট, আমেদাবাদ ও ক্যাম্বের বাজার সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়|

ভারতের অন্তবাণিজ্যের আয়তন সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি| শুধু অনুমান করা যায় আয়তন হয়তো বাড় ছিল| কিন্তু বাজারে সংহতি সাধন কতটা হয়েছিল এই বিষয়ে বিতর্ক আছে|

মোরল্যান্ড সিদ্ধান্ত করেছেন যে, সপ্তদশ শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত পণ্যের দাম স্থিতিশীল ছিল, কেবল তামা, রুপার দামের কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটে ছিল"| কিন্তু মোরল্যান্ডের এই অভিমত গবেষণায় স্বীকৃতি পায়নি|উত্তর ভারতের পাঞ্জাবে ও গুজরাটে খাদ্য-শস্যের দাম যে যথেষ্ট বেড়েছিল এবিষয়ে সন্দেহ নেই| তবে এই দাম সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তা থেকে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত করা সম্ভব নয়|

অধ্যাপক তপন রায় চৌধুরী লিখেছেন, "আন্তঃ-আঞ্চলিক বাণিজ্য দামের কেনা ও বেচার পার্থক্যের উপর নির্ভর করতো| আগ্রা ও গুজরাট অঞ্চলের মধ্যে দামের পার্থক্য স্থলপথে যাতায়াতের ব্যয়ের জন্যই হতো"|

জলপথে যাতায়াতের ব্যয় কম ছিল না| খাদ্যশস্য, লবণ এবং সুরার মত সস্তা পণ্য আঞ্চলিক বাণিজ্যে উপকূল ধরে বা ভিতরের জলপথেই হতো| প্রধান জলপথ গঙ্গা নদী অবশ্যই ছিল|  বারাণসী ও পাটনা হয়ে এলাহাবাদ থেকে রাজমহল পর্যন্ত এই পথ পৌঁছাতো এবং পরে মালদাহ, হুগলি ও ঢাকা পর্যন্ত যেত|

উত্তর-পশ্চিমে বিশেষত লাহোর থেকে নদীমুখ পর্যন্ত সিন্ধু নদ মূল জলপথ ছিল| এক উপকূল থেকে আরেক উপকূল পর্যন্ত এই বাণিজ্যপথ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল|

পরিশেষে তপন রায় চৌধুরী বলেছেন, হিন্দুস্তান, বাংলাদেশ, রাজস্থান, মালব, গুজরাট ও দক্ষিণ জুড়েই এই উপকূলবর্তী জলপথ এক সংহতি সম্ভাবনাকে নিয়ে এসেছিল| বস্তুত মুঘল যুগ একই সঙ্গে জলপথে বাজারের সংহতি সেভাবে ঘটাতে না পারলেও, জলপথে একটা পরিকাঠামো সংহতির জন্য গড়ে তুলতে অনেকটাই অগ্রসর হয়েছিল|


তথ্যসূত্র

  1. সতীশ চন্দ্র, "মধ্যযুগে ভারত"
  2. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, "অষ্টাদশ শতকের মুঘল সংকট ও আধুনিক ইতিহাস চিন্তা"
  3. অনিরুদ্ধ রায়, "মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস"
  4. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, "পলাশী থেকে পার্টিশন"
  5. Shireen Moosvi, "People, Taxation and Trade in Mughal India".

    সম্পর্কিত বিষয়

    সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|

                  ......................................................

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »