চুয়াড় ও পিন্ডারী বিদ্রোহ

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং উনবিংশ শতাব্দীর সূচনার লগ্নে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষক সংগ্রাম হলো চুয়াড় ও পিন্ডারী দস্যুদের বিদ্রোহ| বস্তুত যখন উপনিবেশিক শাসনের প্রসার প্রাপ্ত, তখন উপনিবেশিক শাসকদের অস্বীকার করে ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে কৃষক ও উপজাতি সম্প্রদায় বেশকিছু বিদ্রোহের আগুন ভারতবর্ষের ছড়িয়ে দেয়| এই বিদ্রোহের দুই নিদর্শন হলো চুয়াড় ও পিন্ডারী বিদ্রোহ|

চুয়াড়-ও-পিন্ডারী-বিদ্রোহ
ব্রিটিশ পতাকা



চুয়াড় বিদ্রোহ

মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত ও উত্তর-পশ্চিম অন্তর্গত জঙ্গলমহল নামক বনাঞ্চলের অধিবাসীরা ছিল এই চুয়াড়রা| কৃষিকাজ, পশু শিকার ইত্যাদি পাশাপাশি এরা স্থানীয় জমিদারদের অধীনে পাইক বা সৈনিক হিসেবে কাজ করত| তবে এই কাজের বিনিময় তারা নিষ্কর জমি ভোগ করত| 

চুয়াড়-ও-পিন্ডারী-বিদ্রোহ
কৃষক



ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জমিদারদের উপর করের বোঝা বৃদ্ধি করলে ভূস্বামী শ্রেণীর প্রতিরোধ আন্দোলনে সৈনিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়| পরবর্তীকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য তাদেরকে পাইক বৃত্তি থেকে বরখাস্ত করে এবং তাদের দখলি জমি বাজেয়াপ্ত করার ফলে তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়| 


এর পাশাপাশি কিছু জমিদারদের নিজ স্বার্থ জনিত পরিস্থিতির সৎ ব্যবহার করার উদ্যোগ ও চুয়াড় বিদ্রোহীদের প্রেক্ষিতে কাজ করে| এর ফলে ইংরেজ আইন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এইসব জমিদাররা নিজেদের স্বার্থে চুয়াড় সৈনিকদের সহযোগিতা করে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলেন| 

চুয়াড় বিদ্রোহের আগুন প্রথম জ্বলে ছিল রায়পুরের জমিদার দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে| ধীরে ধীরে এই বিদ্রোহ মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলায় ছড়িয়ে পড়ে| কাশি বাজারে জমিদার, মেদনীপুরের রানী প্রমুখ বিদ্রোহীদের সমর্থন করে|

চুয়াড়-ও-পিন্ডারী-বিদ্রোহ
বিদ্রোহ


শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের উন্নত অস্ত্র ও রণকৌশলের সামনে এই বিদ্রোহ দমন হয়| আধুনিক ঐতিহাসিক বি.বি. চৌধুরী অবশ্য মনে করেন যে, "চুয়াড়দের মনে এই ইংরেজ বিরোধিতা আরো বহুদিন স্থায়ী হয়েছিল| বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরের কৃষক সম্প্রদায় আজও চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতিচারণ করে গর্ববোধ করে"|



পিন্ডারী বিদ্রোহ

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে পিন্ডারী নামে এক দস্যু লুণ্ঠনকারী দল ইংরেজদের সামনে এক অবিচ্ছেদ্য সমস্যা রূপে প্রতিঘাত হয়েছিল| প্রাথমিকভাবে মেওয়ার, মালব, বেরার এবং কিছু দিনের পর নিজাম ও পেশোয়ার রাজ্য এরা হানা দিতে শুরু করে|

প্রথমদিকে পিন্ডারীরা মারাঠা বাহিনীর যোদ্ধা হিসাবে নিযুক্ত ছিল, কিন্তু মারাঠা শক্তি বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে পড়লে পিন্ডারীরা দলবদ্ধ হয়ে ভারতের বিভিন্ন অংশে লুন্ঠনরাজ শুরু করে| সামরিক বাহিনী থেকে কর্মচ্যুত সৈনিক, অবলম্বনহীন বেকার যুবক প্রভৃতি লোকেরা এই পিন্ডারী দলে যোগ দিতে শুরু করে| 


ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মচারী ম্যালকমের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, মুসলমান ভুক্ত পিন্ডারী নারীরা হিন্দু নারীদের মতো আচার-ব্যবহার মেনে চলত এবং এদের মধ্যে কোন ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না| 

তবে দেশের অন্যত্র লুন্ঠনরাজ ও হত্যা চালালেও কোম্পানির রাজ্যে প্রবেশ করার আগে পর্যন্ত ইংরেজরা পিন্ডারীদের অত্যাচার সম্পর্কে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি| প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,  এই পর্যায়ে পিন্ডারীরা 142টি গ্রামবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করে|

চুয়াড়-ও-পিন্ডারী-বিদ্রোহ
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল


এইরকম অবস্থায় কলকাতার কাউন্সিল ও ডাইরেক্টর সভার সদস্যরা পিন্ডারী দমনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং প্রায় এক বছরের প্রচেষ্টায় ইংরেজরা পিন্ডারীদের দমন করতে সমর্থ হয়| পিন্ডারি নেতা করিম খাঁ আত্মসমর্পণ করেন এবং আরেক নেতা আমির খাঁ ইংরেজদের সাথে সমঝোতা করে রাজপুতানার জায়গিরদার হিসেবে নিযুক্ত হয়| এইভাবে ইংরেজরা শেষ পর্যন্ত পিন্ডারী দস্যুদের দমন করেন|

অধ্যাপক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, "পিন্ডারী দস্যুরা উনবিংশ শতকের প্রথমদিকে ইংরেজদের সামনে আইনশৃঙ্খলা এবং সমস্যার পাশাপাশি এক সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করেছিল"|



তথ্যসূত্র

  1. সুমিত সরকার, "আধুনিক ভারত"
  2. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, "পলাশি থেকে পার্টিশন"
  3. Dennis Kincaid, "British Social Life In India, 1608–1937".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. 1946 সালের নৌ বিদ্রোহ (আরো পড়ুন)
  2. সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব এবং এটি কিভাবে বাংলার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল  (আরো পড়ুন)
  3. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »