প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

অতীতের প্রতি ভালোবাসা মানুষের এক জন্মগত গুণ| অতীতের চলমান ধারণা সম্পূর্ণ রূপে চিহ্নিত হয়নি, ভারতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরো অধিক পরিমাণে প্রকটিত হয়| মৌখিক ইতিহাস যেমন- গাঁথা এবং নর প্রশ্বস্তি প্রভৃতির অস্তিত্ব ভারতবর্ষে ঋক বৈদিক যুগ থেকে পাওয়া যায়| এর সাথে পরবর্তী বৈদিক যুগে যুক্ত হয়েছিল ইতিবৃত্ত, আক্ষান, বংশ, বংশচরিত, পুরাণ প্রভৃতি| 

সময়ের সঙ্গে গাঁথা এবং নর প্রশ্বস্তি একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল "আক্ষান"- সাধারণ অর্থে বর্ণনামূলক ইতিহাসকে বোঝায়| "ইতিবৃত্ত" বলতে বোঝায় অতীতের ঘটনা, মানুষের চিরাচরিত ঐতিহ্যের বর্ণনাকে বোঝায়| "বংশ"- রাজকীয় পরিবার সমূহের বর্ণনা| "বংশচরিত"- হলো অনেকটা ঐতিহাসিক দৃষ্টি সমন্বিত, কেননা এখানে বংশের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়| এই সকল উপাদানের মধ্যে "পুরাণ" হলো ইতিহাস রচনার অন্যতম উপাদান|

প্রাচীন-ভারতীয়-সংস্কৃতি-ও-ঐতিহ্য
সন্ন্যাসী



পুরাণ

পুরাণ একাধারে বংশগত ইতিহাস, সাম্রাজ্যে বর্ণনা এবং কালানুক্রমিক শাসকদের বর্ণনা| তবে পুরাণগুলির মূল সমস্যা হলো এগুলিতে জীবনের অস্থায়ী রূপ পাওয়া যায়| জীবনের বস্তুগত রূপটি সেখানে অনুপস্থিত| পুরাণগুলির রচিত হয়েছিল পরবর্তী বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যবর্তী বিভিন্ন সময়ে| মৎস্যপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ রচিত হয়েছিল খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে|

জার্মান গবেষক ম্যাক্স মুলার ইতিহাস চর্চার দিক থেকে পুরাণকে তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন, যথা-
  1. পুরাণ সমূহ ইতিহাসকে বর্ণনা করেছেন রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এবং পুরাণের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শাসকদেরকে, তাদের শাসনকে নয়| 
  2. পুরাণ সমূহ যে বংশ বৃত্তান্ত, কাহিনী এবং সাম্রাজ্যের রুপরেখা রুপরেখা প্রভৃতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা অন্যান্য গ্রন্থ সমূহের পাওয়া যায়নি|
  3. "কুল" সম্পর্কে প্রথম ধারণা আমরা পায় পুরাণ থেকে| কারণ প্রতিষ্ঠিত পরিচিত হতো সেই সময় তাদের কুলের নাম অনুসারে| এই রুপ চারটি গুরুত্বপূর্ণ কুল হলো- সাক্য, চন্দ্র, সূর্য এবং চন্ডাল| পুরাণ সমূহে মৌর্য এবং বৌদ্ধদের সম্পর্কে প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়| 
প্রাচীন-ভারতীয়-সংস্কৃতি-ও-ঐতিহ্য
বৌদ্ধ


ঐতিহাসিক হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী 300 এরও বেশি কুলের কথা বলেছেন| ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার উত্তর ভারতের গঙ্গা-যমুনা বিধৌত অঞ্চলে 12 টির বেশি কুলের কথা বলেছেন| পুরাণগুলি হল কুল সম্পর্কিত বর্ণনার একমাত্র উৎস|

পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণ পুরাণ সমূহকে বিভিন্ন দৃষ্টিতে আলোচনা করেছেন| তারা পুরাণ সমূহকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে বর্ণনা করেছেন| কিন্তু কিছু পুরাণ যেগুলি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে রচিত হয়েছিল, সেগুলি প্রাচ্য দেশীয় ঐতিহাসিক দল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে বিবেচনা করেছেন|

যাইহোক পুরাণ সমূহ বাস্তব এবং কল্পনার জগতের মধ্যে স্বতন্ত্র টানতে পারেনি| কিন্তু এক অর্থে পুরাণ সমূহে বর্ণিত বাস্তব এবং কল্পনার উভয় ঐতিহাসিক উপাদান সমূহের দ্বারা বাস্তব বলে প্রমাণিত হয়েছে| স্যার উইলিয়াম জোন্স, রামনাম বসু, রাজেন্দ্রলাল মিত্র এবং অন্যান্য তাদের অনুবাদের সমূহের মাধ্যমে পুরাণগুলির ঐতিহাসিকত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন|




আক্ষান

আক্ষানকে মহাকাব্য বলা হয়ে থাকে| মহাকাব্যের ঐতিহাসিকত্ব নিয়ে বিতর্ক আছে| কিন্তু আক্ষান ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে| বিখ্যাত মহাভারতের যুদ্ধ এক গৃহযুদ্ধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যা স্থানের নাম, নদীর নাম এবং বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর নাম প্রভৃতি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে|

মহাভারত থেকে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বিবরণ পাই| মনে করা হয় বেদব্যাস মহাভারতের রচয়িতা| তবে ঐতিহাসিকরা মনে করেন, মহাভারতে অসংখ্য লেখক তাদের রচনা সংযুক্ত করেছেন|

যাইহোক মহাভারতের রচনা কাল নিয়ে সন্দেহ থাকলেও মনে হয় 400 খ্রিস্ট পূর্বাব্দ নাগাদ এটি রচিত হয়েছিল এবং এই মহাকাব্যটি চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল গুপ্ত যুগের খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের নাগাদ| মহাভারতকে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ আক্ষান কাব্য বলে মনে করা হয়| এতে 20 লক্ষ শ্লোক আছে| মহাভারতে ঐতিহাসিকত্বের প্রমাণ স্বরূপ পরবর্তীকালে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়|

মহাভারতে বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে পরবর্তীকালে অসংখ্য নাটক এবং গল্প কাহিনী রচিত হয়েছে| উদাহরণ হিসাবে কালিদাসের "অভিজ্ঞান শকুন্তলা" কথা উল্লেখ করতে পারি| মহাভারত 18 টি পর্বে বিভক্ত| মহাভারত থেকে রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, কূটনীতি, যুদ্ধবিদ্যা এবং ভারতের গ্রামীণ সমাজ সম্পর্কে জানতে পারি| মহাভারতের ঐতিহাসিকত্ব পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে|

মহাভারত থেকে সাধারণ মানুষের কথা জানতে পারা যায়| মহাভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী দার্শনিক অংশ হলো ভগবত গীতা| বিভিন্ন ভাষায় লিখিত মহাকাব্য সমূহ সম্পর্কে অধ্যাপক ভান্ডার কর, ডি. ডি. কোশাম্বী এবং মহাকাব্যের বিশেষজ্ঞ এ. এল. ব্যাসাম প্রমুখেরা মহাকাব্য সমূহের আদর্শগত গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন|

প্রাচীন-ভারতীয়-সংস্কৃতি-ও-ঐতিহ্য
ভগবত গীতা


অন্যদিকে রামায়ণকে মহাভারতের তুলনায় কম ঐতিহাসিকত্ব বলে বিবেচনা করা হয়| কারণ রামায়ণের পরিচয় বিশেষভাবে পাওয়া যায় না| তবে একথা সত্য যে, রামায়ণ থেকে আমরা উভয়েই ভারতের বিভিন্ন তথ্য পেয়ে থাকি|

রামায়ণ এবং মহাভারতের তথ্য আছে প্রচুর| কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট, কালসীমা জানা না থাকায় ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ে| তাছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতের প্রচুর পাঠান্তর আছে| ফলে কোন পাঠ আসল, কোনটি নকল তা মীমাংসাও অনেক সময় সম্ভব হয় না|




বেদ 

প্রাচীন ভারতে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান| বেদ হলো চার প্রকার এবং সবচেয়ে প্রাচীন বেদ হলো ঋগ্বেদ, এর সময়কাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব 1800 থেকে অথবা 1500-1000 অব্দ পর্যন্ত| সামবেদ ছিল ঋগ্বেদের অংশ, এর সময়কাল সময়কাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব 1000-600 অব্দ| যর্জুবেদ এর ধর্মীয় উৎসব এবং যাগযজ্ঞের কথা বলা হয়েছে| অথর্ববেদ এর মানুষের বিশ্বাস এবং কুসংস্কারে কথা বলা হয়েছে| প্রত্যেকটি বেদ আবার চারটি অংশে বর্ণিত আছে, যথা-
  1. সংহিতা, এতে বিভিন্ন দেব-দেবীর রূপ ও তার অনুসন্ধানের কথা বলা আছে| ঋগ্বেদ এবং সামবেদ সংহিতা সংকলিত হয়েছিল এবং সুর করে গাওয়া হতো| যজুর্বেদ সংহিতা এবং অথর্ববেদ সংহিতা বর্ণিত আছে জাদু, ডাইনি এবং গুঢ় বিষয় সমূহ|
  2. আরণ্যক, ব্রহ্ম গ্রন্থগুলির পরিশিষ্ট রূপে আর এক শ্রেণী সাহিত্যের উদ্ভব হয়েছে, এদের নাম আরণ্যক| আরণ্যক অংশে অরণ্যে বসবাসকারী মানুষ অথবা সংসার ত্যাগ করে আসার নির্দিষ্ট বয়সে মানুষদের কথা লিপিবদ্ধ আছে| প্রকৃতিগতভাবে গভীর আধ্যাত্মবাদ নিঃসৃত আরণ্যক রচিত হয়েছিল ধ্রুপদী ভাষায়| আর আরণ্যক বিভিন্ন মার্গীয় দর্শনের কথা বলা হয়েছে| যেমন- কর্মমার্গ, ঞ্জানমার্গ প্রভৃতি| এই দুই মার্গকে জীবনে মোক্ষ লাভের পথ হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে|
  3. ব্রাহ্মণ, বাহ্মণ হলো সংহিতার ব্যাখ্যা| ব্রাহ্মণ ছিল বিভিন্ন ধরনের যেমন- ঐতেরিয় বাহ্মণ, কোষিতোগী বাহ্মণ| এগুলি ছিল ঋগ্বেদের সঙ্গে যুক্ত| জৈমেনীয় ছিল সামবেদের সঙ্গে যুক্ত|  ঐতেরিয় বাহ্মণ এবং শতপথ বাহ্মণ ছিল যজুর্বেদের সঙ্গে যুক্ত| গোপথ বাহ্মণ ছিল অথর্ববেদের সঙ্গে যুক্ত|
  4. উপনিষদ‌, আরণ্যকে পরিশিষ্ট রূপে আবার বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছে, এগুলি উপনিষদ‌ নামে পরিচিত| উপনিষদ‌ বা বেদান্ত হলো আর্যদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং উপনিষদে ধর্মীয় জ্ঞানের স্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে| এতে আত্মা ও ব্রহ্ম বা জীবাত্মা পরমাত্মাকে কেন্দ্র করে মূল সুর ধ্বনিত হয়েছে|

বেদাঙ্গ

বেদের বর্ণ ও স্বরধ্বনি যাতে অবিকৃত থাকে, যাগ-যজ্ঞ যাতে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়ক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, এইগুলি বেদাঙ্গ নামে পরিচিত| বেদাঙ্গে 6 টি বিভাগ আছে, যথা- শিক্ষা, কল্প ব্যাকরণ, নিরুত্তর, ছন্দ, জ্যোতিষ|

সমগ্র বৈদিক গ্রন্থসমূহ জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন| এই দুই জগত সম্পর্কে জ্ঞান বা বিদ্যা এবং অবিদ্যা সম্পর্কিত জ্ঞানের কথা ব্যক্ত হয়েছে| সুতরাং ঐতিহাসিকদের পক্ষে বৈদিক গ্রন্থ সমূহের ঐতিহাসিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্তে আসা কষ্টময়| কেননা এগুলি সংকলিত হয়েছিল ছন্দের আকারে| যাইহোক প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হিসেবে বৈদিক সাহিত্য সমূহ এই দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ| এই কারণে যে, আমরা উত্তর ভারতে গাঙ্গেয় সমতল ভূমির রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের বিবর্তন এবং রাজনীতি সম্পর্কিত ধারণা লাভ করি|



তথ্যসূত্র

  1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় "প্রাচীন ভারতের ইতিহাস" (প্রথম খন্ড)
  2. Poonam Dalal Dahiya, "Ancient and Medieval India"
  3. Upinder Singh, "A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century"

সম্পর্কিত বিষয়

  1. ঋক বৈদিক যুগ এবং পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মীয় ভাবনা (আরো পড়ুন)
  2. বৈদিক এবং ঋক বৈদিক যুগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Note: Email me for any questions:

    :-Click here:-.

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »

    আপনার মতামত শেয়ার করুন ConversionConversion EmoticonEmoticon

    Top popular posts