ভারতের মহাজনপদ উত্থানের ইতিহাস

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক কালে ভারতবর্ষে বেশ কয়েকটি মহাজনপদ বা আঞ্চলিক রাজ্য গড়ে উঠেছিল| মূলত উত্তর ভারতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জনপদগুলি বেশিরভাগই ছিল রাজতন্ত্র সমন্বিত| ঋক বৈদিক যুগে পরবর্তীতে গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে শাসন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে এবং সময় সঙ্গে সঙ্গে জনপদগুলি ধীরে ধীরে প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠে|

মহাজনপদ
গৌতম বুদ্ধ



আলোচনার সুবিধার্থে প্রাচীন গ্রন্থ সমূহের উল্লেখিত ষোড়শ মহাজনপদের নাম দেওয়া হল-
  1. অবন্তী
  2. অঙ্গ
  3. অস্মক
  4. কম্বোজ
  5. কাশী
  6. কুরু
  7. কোশল
  8. চেদি
  9. বজ্জি  অথবা  বৃজি
  10. বৎস
  11. গান্ধার
  12. মৎস্য  অথবা  মচ্ছ
  13. মগধ
  14. পাঞ্চাল
  15. মল্ল
  16. শূরসেন


মহাজনপদ উত্থান

বুদ্ধদেবের সময় কালে ভারতীয় কৃষিতে লোহার ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছিল| বৌদ্ধ গ্রন্থ "সুত্তনিপাত"- এর লোহার ফলার কথা রয়েছে| মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকা তথা নরম মাটিতে লোহার ফলার ব্যবহার করে কৃষিজ ফসল পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করা হতো| পাশাপাশি ধাতব মুদ্রা তৈরিতে বিশেষত বিভিন্ন সংকেত চিহ্নিত মুদ্রা তৈরিতে ব্যাপকভাবে লোহার ব্যবহার হতে থাকে| কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত উৎপাদন হওয়ার ফলে বাণিজ্য বৃদ্ধি, বহুবিধ করের প্রচলনের পাশাপাশি সমাজের শ্রেণীকরণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা পরবর্তীতে পেশাদার শ্রমিকদের জন্ম দিয়েছিল|

বৈশ্য এবং শূদ্র গণ সমাজে রাজন্যবর্গ, সেনাবাহিনী, পুরোহিত সম্প্রদায়ের জন্য উৎপাদনের পাশাপাশি রাজস্ব প্রদান করত| বৌদ্ধ সাহিত্যে উক্ত বিষয়গুলি উল্লেখ রয়েছে| মগধ এবং কোশল রাজ্যের আমলাতন্ত্রের কথা সাহিত্য থেকে পাওয়া যায়| কর হিসাবে বলি", "শুল্ক", "কর" এবং "ভাগ" আদায় করা হত| "বলিসাধক" এবং "ককর" নামক কর্মচারীগণ কর আদায় সঙ্গে যুক্ত ছিলেন|

কিন্তু আঞ্চলিক রাজ্যগুলির উত্থানে উক্ত ব্যাখ্যা সর্বজনগ্রাহ্য নয়| এই ব্যাখ্যায় লোহার ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা, উদ্বৃত্ত উৎপাদন ইত্যাদি বিষয়গুলিকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, যা একপেশে রূপ ধারণ করেছে| বর্ণ ব্যবস্থা, শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব, রাজস্ব ব্যবস্থা ইত্যাদি পুরোপুরি ভাবে ব্যাখ্যা না হওয়ায় রাজ্য গঠনের মূল ব্যাখ্যা ঠিক সম্পূর্ণরূপে পরিপুষ্ট হয়নি|

মহাজনপদ
কৃষক


রোমিলা থাপার তাঁর "Early India" গ্রন্থের "states and cities of the indo-gangetic plain" প্রবন্ধে রাষ্ট্রের উৎপত্তি এক ভিন্নতর ব্যাখ্যা করেছেন| তিনি নৃতাত্ত্বিক বিভিন্ন ধারণা সমূহ যেমন- সমান্তরাল সমাজ ব্যবস্থা, গৃহভিত্তিক অর্থনীতি ইত্যাদি বিবর্তনের মাধ্যমে একদিকে যেমন সমাজ বর্ণভিত্তিক সমাজে বিভিন্ন স্তর গড়ে তুলেছিল, অন্যদিকে এই বিষয়গুলি পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল|

রোমিলা থাপার এর মতে, বৈদিক সমাজে "রাজন্য", "বিশ" ইত্যাদি প্রান্তীয় গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়| এই প্রান্তীয় গোষ্ঠীগুলির হাতে জমির মালিকানা রক্ষিত ছিল, সময়ের সাথে সাথে রাজন্যবর্গ যৌথ মালিকানাধীন জমির উপর নিজের দাবী প্রতিষ্ঠিত করে| পরবর্তী বৈদিক যুগের পর থেকে আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় বদল আসে| গৃহস্থালি ভিত্তিক অর্থনীতির সূচনা ঘটে, যেখানে পরিবার হয়ে উঠে মুখ্য এবং পরিবারের সকল সদস্যরা পূর্বে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নিত| পরবর্তীতে উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবারের বাইরে সদস্যদের প্রয়োজন দেখা দিলে ধীরে ধীরে সমাজে শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে| বর্ণ ভিত্তিক সমাজে এরা শূদ্র হিসেবে পরিচিত হয়| এইভাবে প্রান্তীয় সমাজ এক জটিল সমাজের রূপ ধারণ করেছে, যা পরে বিবর্তিত হয়ে রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে|

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বুদ্ধদেবের সময়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থার উৎপত্তি বিষয় বলতে গিয়ে থাপার পরিবেশ, প্রযুক্তি বিদ্যা, সামাজিক স্তরবিন্যাস, নগরায়ন ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ করে বলেছেন যে, উক্ত বিষয়গুলির পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল| তাঁর মতে, এই উৎপাদন গুলি প্রতিটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ| তিনি তাঁর রচনায় দেখিয়েছেন যে, উদ্বৃত্ত উৎপাদন সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তর বিন্যাসের জন্ম দিয়েছিল| পাশাপাশি সমাজের অনুৎপাদক গোষ্ঠী যথা- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় উৎপাদক গোষ্ঠীর উদ্বৃত্ত উৎপাদনের উপর নির্ভর করতো| আবার উদ্বৃত্ত উৎপাদনের জন্য উন্নতর প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল, যার চাহিদা মিটিয়ে ছিল লোহার ব্যবহার| ফলে উন্নত প্রযুক্তি ও উদ্বৃত্ত উৎপাদন  অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত ছিল|

রোমিলা থাপার দেখিয়েছেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ধর্মীয় ব্যবস্থা হিসাবে বৌদ্ধ ধর্ম গণ সংঘ ও রাজতন্ত্র উদ্ভবের বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল| আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থানে বৌদ্ধ সংঘ গুলি প্রাথমিক সহায়তা করেছিল| কারণ এগুলিতে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষের সমাহার ঘটত| আবার গণ সংঘ গুলিকে টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রয়োজন ছিল| অজাতশত্রু এবং অশোক বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন| এই বিশ্লেষণ থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, মহাজনপদ গুলির ছিল হয় রাজতন্ত্র নয় গণ সংঘ|

উত্তর-পূর্ব ভারতের মল্ল ও বৃজি প্রজাতন্ত্রে ক্ষত্রিয়দের হাতে জমির সাধারণ মালিকানা রক্ষিত ছিল| অন্যদিকে উচ্চ গাঙ্গেয় অববাহিকায় অবস্থিত কুরু রাজ্যের পরবর্তী বৈদিক যুগের বিভিন্ন প্রথা, যেমন- পশু বলি, যাগযজ্ঞ ইত্যাদি চালু থাকলেও মধ্য গাঙ্গেয় অববাহিকার কোশল ও মগধ রাজ্যে তা ছিল অনুপস্থিত| রাজমহল পাহাড়ের পর্যাপ্ত কাঠ, হাতি, গঙ্গা নদী ধরে দক্ষিণাবর্তী বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ন্ত্রক ছিল মগধ| এই কারণে মগধে নগরায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছিল|

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে শিল্প ব্যবস্থার উন্নতি, রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ, বাণিজ্যিক উন্নতি, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আচার পালন, বিদ্যা চর্চার বিকাশ ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় নগরায়নের সূচনা হয়েছিল| মগধের রাজধানী পাটলীপুত্র ছিল বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কার্যাবলীর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল| কাশীর রাজধানী বারাণসী, উত্তর কোশলের রাজধানী শ্রাবন্তী, বৃজির রাজধানী বৈশালী ইত্যাদি নগর মূলত তাদের ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে গড়ে উঠেছিল| মগধের নালন্দা ও অঙ্গের বিক্রমশিলা, অবন্তীর উজ্জয়িনী ইত্যাদি বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে| পরবর্তীতে এই ধারাবাহিক নগরায়ন রাষ্ট্রের ধারণাকে সংগঠিত করেছিল|



তথ্যসূত্র

  1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় "প্রাচীন ভারতের ইতিহাস" (প্রথম খন্ড)
  2. Poonam Dalal Dahiya, "Ancient and Medieval India"
  3. Upinder Singh, "A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century"

সম্পর্কিত বিষয়

  1. ঋক বৈদিক যুগ এবং পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মীয় ভাবনা (আরো পড়ুন)
  2. বৈদিক এবং ঋক বৈদিক যুগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা (আরো পড়ুন)
  3. প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Note:- Please share your comment for this post :

    :

    --Click here:--

    Mock Test

    Visit our Mock Test Episodes - (click here)

    Share this post with your friends

    please like the FB page and support us

    Previous
    Next Post »