4 ঠা মে আন্দোলন

1911 সালের বিপ্লবের দ্বারা চীনে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও চীনের বুকে অবিমিশ্র শান্তি বিরাজ করেনি| প্রজাতন্ত্র নিছক প্রহসনে পরিণত হয়েছিল| এই অলীক প্রজাতন্ত্রকে কণ্ঠরোধ করে চীনে শুরু হয়েছিল সমরনায়কদের শাসন| চীনের বুকে নেমে এসেছিল চরম অরাজকতা| চীনের জাতীয় ঐক্য নষ্ট হয়েছিল এবং সমরনায়কদের দুর্নীতি ও অপশাসনের চীনাদের নৈতিক মূল্যবোধ কমে গিয়েছিল| 

আধুনিক চীনের ইতিহাসে এই সময়কে অন্ধকারময় যুগ বললে কিছু ভুল বলা হয় না| তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই অন্ধকারের মধ্যেই ছিল সোনালি দিনের ভবিষ্যৎ|

সমরনায়কদের ধূর্ততা, অসাধুতা ও দুর্নীতি যুবসমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে ভাবিয়ে তুলেছিল, যার ফলশ্রুতি ছিল "4 ঠা মে আন্দোলন"| এই আন্দোলন চীনের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও চিন্তাজগতে এক সুদুরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে আসে|

4-ঠা-মে-আন্দোলন
চীনের মানচিত্র

4-ঠা-মে-আন্দোলন
আন্দোলন



4 ঠা মে আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য 

রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য

4 ঠা মে আন্দোলনের যেসব শক্তি ছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল নব উদ্ভূত জাতীয়তাবোধ| বৈদেশিক শক্তিবর্গের কাছে চীনের লাঞ্ছনার ফলে যে জাতীয়তাবোধের জন্ম হয়েছিল, তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এর সময়ে জাপানের লগ্ন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবহারে হঠাৎ দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল|

প্রকৃতপক্ষে চৌঠা মে আন্দোলন ছিল চীনের উপর বৃহৎ শক্তিবর্গের অপমানজনক শর্তাবলী জোর করে চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে এক দেশ প্রেমিক প্রতিবাদ|  আন্দোলনকারীদের জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল 'জিউগুয়ো" অর্থাৎ দেশকে বাঁচাও(Save the country)|

4-ঠা-মে-আন্দোলন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ


পিকিং এর বিক্ষোভকারীরা তাদের উদ্দেশ্য খোলাসা করেই ব্যক্ত করেছিলেন- বহিরাক্রমণের দিক দিয়ে চীনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম চালাতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে|

4ঠা মে রাজনৈতিক সংগ্রাম একইসাথে বৃহৎ শক্তিগুলোর চীনের প্রতি সাম্রাজ্যবাদী ও অসম চুক্তি ব্যবস্থা চালিয়ে থাকার নীতি এবং এই সমস্ত বৃহৎ শক্তিবর্গের লালসা বৃদ্ধিকারী অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দেশের লক্ষ্য ছিল, রক্ষণশীল অংশের সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়বৃত্তি করার নীতির বিরোধিতা করেছিল| এই যোগসূত্রে প্রায় 20 বছর পর মাও-সে-তুংকে ও চীনা বিপ্লবকে একই সাথে "সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী" এবং "সামন্ততন্ত্র বিরোধী" হিসাবে আখ্যায়িত করতে সাহায্য করেছিল| চীনের বিপ্লবের এই সংজ্ঞাই ছিল মাও-সে-তুং এর নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণার তাত্ত্বিক ভিত্তি|

4ঠা মে আন্দোলনের আরো একটি মৌলিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ছিল, আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা| এই আন্দোলনের পেছনে কোন সংগঠিত বা সক্রিয় রাজনৈতিক দলের হাত ছিল না| সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও ছাত্র সংগঠন, বণিক সংগঠন এবং শ্রমিক সংগঠনগুলি ও বিভিন্ন বামপন্থী পত্র-পত্রিকার সাথে যুক্ত বুদ্ধিজীবীরা এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন| তারা সাম্রাজ্যবাদ ও তার অভ্যন্তরীণ সহায়ক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের সূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন| চৌঠা মে আন্দোলনের ফলশ্রুতি হিসেবে চীনের ঐতিহ্য বিরোধী ও প্রগতি পন্থী বুদ্ধিজীবীরা "ইয়ৎ চায়না(Young China) নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছিল| 




সামাজিক বৈশিষ্ট্য 

4ঠা মে আন্দোলন সামাজিক ক্ষেত্রেও নানাবিধ মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল| সাবেকি পরিবার ব্যবস্থা ক্রমশ ক্ষয় পেতে থাকে| পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের ঠিক করে দেওয়া বিবাহ ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রেমের ভিত্তিতে বিবাহ গুরুত্ব পেতে থাকে| পুরনো পরিবার ও গোষ্ঠী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চীনের যুব ছাত্ররা সমাজে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালাতে থাকে|

চীনা সামন্ততান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ| মাও-সে-তুং এর ভাষায় তারা চারটি শৃঙ্খলে বাঁধা ছিল- রাজনৈতিক, ধর্মীয়, গোষ্ঠীগত এবং স্বামীর| বহু নারী নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করতে বাধ্য হলে আত্মহত্যা করতেন|

4-ঠা-মে-আন্দোলন
মাও-সে-তুং


চৌঠা মে আন্দোলন চীনা নারীদের দুরবস্থার কথা বার বার তুলে ধরে| নারীদের সন্তান প্রতিপালন ও গেরস্থালী সমালোচনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সমবায় ব্যবস্থা, নার্সারি সামাজিক নিরাপত্তা ছবিটির কথা বলা যায়| সনাতনী শৃঙ্খলের বন্ধন ভেঙ্গে মেয়েরা বেরিয়ে আসতে শুরু করে| বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়া-কলাপে তারা অংশগ্রহণ করতে থাকে| বাস্তবিকই 4ঠা মে আন্দোলন চীনের অভ্যন্তরে এক "পারিবারিক" বিপ্লব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়|



সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য 

1915 সাল থেকে চীনের শহরগুলিতে যে নতুন সংস্কৃতির জোয়ার এসেছিল, তারই অনিবার্য পরিণতি ছিল 4ঠা মে আন্দোলন| বিগত কয়েক বছর ধরে বৌদ্ধিক চরমপন্থার দ্বারা লালিত ছাত্ররা 1919 সালে মে-জুন মাসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন| এই আন্দোলন শুরু হওয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ছাত্রদের পাঠচক্র এবং বামপন্থী পত্র-পত্রিকার সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল| এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হুনান ছাত্র সমিতির চাংসা থেকে প্রকাশিত "Hsiang Riven Review" পত্রিকাটি|

4 ঠা মে আন্দোলন মাতৃভাষার প্রগতির পথ প্রশস্ত করেছিল| আন্দোলনকারীরা স্বদেশী বাইহুয়া(Baihua) ভাষায় তারা তাদের পোস্টার ব্যানার লিখতেন এবং রাজনৈতিক ইস্তাহারগুলি প্রকাশ করেছিলেন| এমনকি এই সময় যেসব গ্রন্থ লেখা হয়েছিল সবই ছিল স্বদেশী বাইহুয়া(Baihua) ভাষায়| সহজ-সরল চালিত ভাষায় এইসব সাহিত্য জনগণের মধ্যে জাতীয় চেতনার ঘটাতে সক্ষম হয়|


চীনের 4 ঠা মে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক বৌদ্ধিক এবং রাজনৈতিক বিশ্বজনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল| আমেরিকার বুদ্ধিজীবী ডিউই-র বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, ব্রিটিশ দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের মুক্তিপন্থী সমাজতন্ত্রবাদ সম্পর্কিত ধারণা, ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথের প্রাচ্যের ভাবাদর্শ নিয়ে বক্তব্য, রুশ সাহিত্যিক টলস্টয়ের মানবিকতা ও মানবতাবাদ এবং সর্বোপরি কার্ল মার্কস এবং এঈলেস কর্তৃক প্রচারিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের তত্ত্ব- এ সবকিছুই তৎকালীন চীনা ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের আকৃষ্ট করেছিল| আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিক বিক্ষোভ দেখানোর সাথে সাথে নতুন সংস্কৃতির অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন|

4-ঠা-মে-আন্দোলন
কার্ল মার্কস

4-ঠা-মে-আন্দোলন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


4 ঠা মে আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা

4 ঠা মে আন্দোলনের সুবিশাল সাফল্য থাকা সত্ত্বেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল| চাও-সে-সুং এর মতে 4ঠা মে আন্দোলন সাবেকি ঐতিহ্যকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে বিচার করেনি, তাই কনফুসীয় মতাদর্শ ও জাতীয় ঐতিহ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়নি| চীনের ঐতিহ্য নস্যাৎ করে পশ্চিমী চিন্তাধারা প্রচলনের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের এই সংঘাতে নতুন কোনো ধারণার উৎপত্তি হয়নি|


মূল্যায়ন 

তা সত্ত্বেও বলা যায় যে, এই আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল সুদূরপ্রসারী| এই আন্দোলন শ্রমিক শ্রেণীর গৌরবময় রাজনৈতিক লড়াইয়ে সূচনা করেছিল| এই আন্দোলন 1921 সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল|

উদারপন্থীদের মতে, এই আন্দোলন পুরনো চিন্তা ধারা, পুরনো নীতিবোধ, পুরনো মূল্যবোধ থেকে চীনের মানুষকে মুক্ত করেছিল এবং চীনের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছিল| চরমপন্থীদের কাছে এই আন্দোলন ছিল চীনের নতুন যুগের উত্তোলনের পথিক ছিল|



তথ্যসূত্র

  1. অমিত ভট্টাচার্য, "চীনের রূপান্তরের ইতিহাস 1840-1969"
  2. Jonathan Fenby, "The Penguin History of Modern China".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. প্রথম আফিম যুদ্ধ (আরও পড়ুন)
  2. তাওবাদ কি (আরো পড়ুন)
  3. কনফুসিয়ানিজম কি (আরো পড়ুন)
  4. হুং সিউ চুয়ান (আরও পড়ুন)

Author of this post

Name- Bhanu Mathi Ghosh
About- তিনি বর্তমানে একজন ইতিহাসের ছাত্রী
Read more- (Click here)

                     .............................................


Previous Post Next Post

মক টেস্ট

ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে- Click Here

সাহায্যের প্রয়োজন ?

প্রশ্ন করুন- Click Here

ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

Delivered by FeedBurner