হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার পার্থক্য কি ছিল

হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করার আগে একটি বিষয়ে আলোচনা করা নেওয়া জরুরি। বিষয়টি হলো এই যে দুটি সভ্যতায় এক না ভিন্ন। এই ধরনের প্রশ্নের মূল পরিপ্রেক্ষিত হলো এই যে, 1930 এর দশকে সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের আগে ঋক বৈদিক সভ্যতাকে ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা বলে গণ্য করা হতো। 

হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার পার্থক্য কি ছিল


বেশিরভাগ পন্ডিতের মতে, প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ রচিত হয়েছিল আনুমানিক 1500 খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ। স্বাভাবিকভাবেই বৈদিক সভ্যতার সময়কালকে 1500 খ্রিস্টপূর্বাব্দ ও তারপরে নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার কাল নির্ণয় করেছেন, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব 2300 থেকে 1700 খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে। সুতরাং কালানুক্রমের ভিত্তিতে বলা যায় যে, হরপ্পা সভ্যতা বৈদিক সভ্যতার পূর্ববর্তী।

উক্ত ধারণা আরো স্পষ্টতর হবে হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার মৌলিক পার্থক্যগুলি আলোচনা করে। উভয় সভ্যতার মধ্যে খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ প্রভৃতি বিষয়ের বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্য থাকলেও অনেক বিষয় পার্থক্য বিদ্যমান।


প্রথমত:

হরপ্পা সভ্যতার মানুষ ছিল প্রধানত নগরবাসী। নগরজীবনের ছাপ এতে স্পষ্ট। সুতরাং এটি যে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ ইটের তৈরি বড় বড় অট্টালিকা, বৃহৎ স্নানাগার, পরিকল্পনা মাফিক রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং সুন্দর ও উন্নত জল নিকাশি ব্যবস্থা প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। অপরদিকে আর্য সভ্যতা ছিল প্রধানত গ্রামীণ সভ্যতা। চাষাবাদ তথা কৃষিকাজের ওপরই আর্যরা মূলত জীবিকা নির্বাহ করতো। বৈদিক আর্যদের আর্থসামাজিক জীবন যাত্রার সবটাই গ্রামের উপর নির্ভরশীল ছিল। এইভাবে দেখা যাচ্ছে যে, প্রকৃতিগত দিক থেকে দুটি সভ্যতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার পার্থক্য কি ছিল


দ্বিতীয়তঃ 

বৈদিক আর্যদের কাছে ঘোড়া ছিল সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জন্তু। ঘোড়ার ব্যবহারে সুদক্ষ হবায় আর্যদের যাযাবর ও ভাম্যমান জীবন গতিময় ছিল। কিন্তু হরপ্পা সভ্যতায় ঘোড়ার ব্যবহার ব্যবহারের নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই। বৈদিক সভ্যতা যে হরপ্পা সভ্যতার পরবর্তী এই বিষয়টি থেকে তা আরো স্পষ্টতর হয়।


তৃতীয়তঃ 

বৈদিক আর্যরা যুদ্ধের ব্যাপারে ছিল সিদ্ধহস্ত। আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষা উভয় বিষয়ে তারা পারদর্শিতা অর্জন করেছিল। স্বাভাবিকভাবে তারা অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার ভালো জানতো। কিন্তু হরপ্পা সভ্যতার মানুষ অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন ছিল বলে মনে হয় না।


চতুর্থত: 

হরপ্পা সভ্যতা ছিল তাম্র যুগের সভ্যতা। এই সভ্যতার প্রযুক্তিবিদ্যা ছিল তাম্র নির্ভর। এই সভ্যতার মানুষদের কাছে লোহার ব্যবহার অজ্ঞাত ছিল। কিন্তু বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগে লোহার যথেষ্ট প্রচলন ঘটেছিল।


পঞ্চমত :

ধর্মগত বিষয়ে উভয় সভ্যতার মানুষের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আলোচনার প্রসঙ্গে দেখা গেছে যে, সিন্ধু সভ্যতা মানুষ গাছপালা, জীবজন্তু সহ শিব ও মাতৃকোষে আরাধনা করত। এছাড়াও হরপ্পীয়রা লিঙ্গ উপাসনা করত। কিন্তু বৈদিক আর্যদের আমলে মাতৃকোষ ও লিঙ্গ পূজার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় ক্ষেত্রে হরপ্পা সভ্যতার মানুষ মাতৃ শক্তি এবং বৈদিক আর্যরা পুরুষ শক্তির প্রভৃতি আস্থাশীল ছিল।


ষষ্ঠতঃ 

হরপ্পা সভ্যতার মানুষের মধ্যে লিখন প্রণালী বহুল প্রচলন ছিল। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো প্রাপ্ত অসংখ্য সিলমোহরে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অপরদিকে আর্যদের মধ্যে লিখন প্রণালী চল ছিল না।


সপ্তমতঃ 

সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সভ্যতা যে অভিন্ন নয় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মৃৎপাত্র। সিন্ধু সভ্যতার উৎখনন এর ফলে যে মাটির পাত্র গুলি পাওয়া গেছে সেগুলির রঙ কালো ও লাল। কিন্তু আর্য সভ্যতা যেখানে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, সেই কুরু পাঞ্চাল প্রদেশের মৃৎপাত্রের রং ছিল ধূসর বর্ণ এবং এগুলিতে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির কোনো ব্যাপার ছিল না অর্থাৎ এগুলি ছিল একেবারে সাধারণ প্রকৃতির।


অষ্টমত: 

হরপ্পা সভ্যতার জীবনযাত্রা আলোচনার প্রসঙ্গে আমরা দেখেছি যে, স্নান ব্যবস্থার উপর সেখানে মানুষের অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করতো। নগর গুলির প্রায় প্রতিটি বাড়িতে স্নানাগার এর উপস্থিতি এই ধরনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বৈদিক আর্যরা স্নান ব্যবস্থার উপর খুব কমই গুরুত্ব দিত।


নবমত: 

বৈদিক আর্যরা মৃত ব্যক্তিকে দাহ করত, কিন্তু হরপ্পা সভ্যতার ধারকরা মৃত ব্যক্তিকে সমাধি দিতো। এই সভ্যতার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্রসমূহে সমাধি হলের অস্তিত্ব থেকে এই ধারণা লাভ সম্ভব হয়েছে।

সুতরাং প্রাক আর্য সভ্যতা হিসেবে হরপ্পা সভ্যতাকে চিহ্নিত করা স্বাভাবিক হবে। তবে বৈদিক সভ্যতার পূর্ববর্তী হলেও এই সভ্যতার তুলনায় হরপ্পা সভ্যতা যে অনেক উন্নত ছিল সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।


হরপ্পা সভ্যতার কাছে পরবর্তী বৈদিক সভ্যতা ঋণী

স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠবে তাহলে কি ভারতের ইতিহাসে উপর প্রথম নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা হিসেবে পরিচিত হরপ্পা সভ্যতার কোন অবদান নেই? এই ধরনের মৌলিক প্রশ্ন অবশ্যই আমাদের ভাবায়। বস্তুত যদি পরবর্তীকালের ইতিহাসে এর বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক বিচার করা যায় তাহলে দেখা যাবে যে, প্রায় 200 বছর স্থায়ী এই সভ্যতা নিশ্চিতভাবে কিছু অবদান রেখে গেছে। হয়তো চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই, তথাপি কিন্তু ধারণা লাভ করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। নন্দ মৌর্য আমলে যে ছাপ যুক্ত মুদ্রা ও প্রতীকের পরিচয় আমরা পাই তার একটি আভাস মিলে সিন্ধু উপত্যকার হরব গুলিতে- এই ধরনের মন্তব্য করেছেন এ.ডি.পি.পুসলকার। তিনি আরো বলেছেন যে, প্রাচীন ভারতীয় মুদ্রার ছাঁচ ও কাঠামোর জন্য আমরা কিছুটা সিন্ধু সভ্যতার মানুষের কাছে ঋণী।

হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার পার্থক্য কি ছিল

হরপ্পা ও বৈদিক সভ্যতার পার্থক্য কি ছিল

ধর্মগত দিক থেকেও হরপ্পা সভ্যতার স্পষ্ট কিছু প্রভাব পরিলক্ষিত হয় পরবর্তী সভ্যতায়। সিন্ধু তথা হরপ্পা সভ্যতায় শিব পশুপতি যে মূর্তি পাওয়া যায় তা ভারতের পরবর্তী সভ্যতাতেও লক্ষ্য করা যায়। মনে করা খুব একটি অসঙ্গত হবে না যে পরবর্তীকালে যে শিবলিঙ্গ পূজার প্রচলন ঘটে ছিল তা হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকে চলে আসছিল। অর্থাৎ এ ব্যাপারে পরবর্তী সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা কাছে ঋণী। এ প্রসঙ্গে এ.ডি.পি.পুসলকারের বক্তব্য হল- দক্ষিণামূর্তি হিসাবে শিবের যে মূর্তি পাওয়া যায় এবং যোগীর ভূমিকায় বুদ্ধের যে মূর্তির কথা আমরা জানি তা ছিল পরোক্ষভাবে হরপ্পা সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।

এছাড়া সম্প্রতি এমনও কিছু তথ্য আবিষ্কৃত হয়েছে যার ভিত্তিতে মনে হয় যে, ওজন ও মেট্রিক পদ্ধতি হরপ্পীয়দের জানা ছিল। এই সমস্ত বিষয়গুলি থেকে বোঝা সম্ভব হয় যে, হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে এর পরবর্তীকালের ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির পুরোপুরি বিচ্ছেদ ঘটেনি।


তথ্যসূত্র

  1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় "প্রাচীন ভারতের ইতিহাস"
  2. Upinder Singh, "A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. ঋক বৈদিক যুগ এবং পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মীয় ভাবনা (আরো পড়ুন)
  2. বৈদিক এবং ঋক বৈদিক যুগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা (আরো পড়ুন)
  3. প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................


    নবীনতর পূর্বতন
    👉 Join Our Whatsapp Group- Click here 🙋‍♂️
    
        
      
      
        👉 Join our Facebook Group- Click here 🙋‍♂️
      
    
    
      
    
       
      
      
        👉 Like our Facebook Page- Click here 🙋‍♂️
    
    
        👉 Online Moke Test- Click here 📝📖 
    
    
        
      
               
    
     Join Telegram... Family Members
      
         
                    
                    
    
    
    
    
    
    
    

    টেলিগ্রামে যোগ দিন ... পরিবারের সদস্য

    
    
    
    
    
    
    
    
    
    

    নীচের ভিডিওটি ক্লিক করে জেনে নিন আমাদের ওয়েবসাইটটির ইতিহাস সম্পর্কিত পরিসেবাগুলি

    
    

    পরিক্ষা দেন

    ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে এবং নিজেকে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুত করুন- Click Here

    আমাদের প্রয়োজনীয় পরিসেবা ?

    Click Here

    ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

    নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

    Delivered by FeedBurner