উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের পার্থক্য

উপনিবেশবাদ শব্দটি "উপনিবেশ" শব্দ থেকে উদ্ভূত| সাধারণত কোন রাষ্ট্র যদি অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে নিজ  অধীনস্ত করে, তাহলে অধীনস্থ এলাকা থেকে সেই রাষ্ট্রে "উপনিবেশ" বলা হয়|

সাধারণভাবে বলতে গেলে উপনিবেশবাদ হলো অন্য ভৌগোলিক এলাকার উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করে ধীরে ধীরে সেখানকার অর্থনীতি, রাজনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নিজ নিয়ন্ত্রণে আনা|

মূলত ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে উপনিবেশিক শক্তি হিসাবে এশিয়া ও আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে উপনিবেশবাদের সূচনা করেছিল|

উপনিবেশবাদ-ও-নব্য-উপনিবেশবাদের-পার্থক্য
পৃথিবীর মানচিত্র


উপনিবেশবাদের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো, অধীনস্থ রাষ্ট্রগুলি উপর সম্যকভাবে রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য কায়েম| উপনিবেশবাদের রূপ যাইহোক না কেন এর উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ গুলিকে বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কাঁচামাল ও রসদ জোগানের ভান্ডার হিসেবে গড়ে তোলা|

অধ্যাপক Brutents এর মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রধান ভূমিকা সর্বগ্রাসী উপনিবেশবাদের প্রসারে সহায়তা করেছিল| ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের জনগণের নির্লিপ্ততার কারণে উপনিবেশবাদ তার সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছিল| আবার পারস্পরিক মিত্র হিসাবে পরিগণিত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিকে কোনরূপ সহায়তা করত না|

উপনিবেশবাদ বিস্তারের জন্য মূলত দায়ী ছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশ| এশিয়া এবং আফ্রিকার উপনিবেশগুলি মহাজনী পুঁজি বিনিয়োগের কাজে ব্যবহৃত হয়, তার ফলে উপনিবেশ গুলির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়| কিন্তু বেসামাল অর্থনীতি, উপনিবেশ গুলির জনগণের বধিত স্বাধীনতা স্পৃহা এবং তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার ক্রম বিস্তারের ফলে উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে উপনিবেশ ত্যাগ করতে থাকে| কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির উপর অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনুশাসনের পথ তৈরি করে, যা নব উপনিবেশবাদের জন্ম দিয়েছিল|

অধ্যাপক  Brutents এর মতে, নব্য উপনিবেশবাদ  হলো, তৃতীয় বিশ্বের সকল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পশ্চাৎগামী সাম্রাজ্যবাদের প্রক্রিয়া| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলি পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তি সৃষ্টি অর্থনৈতিক  শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল| উপনিবেশবাদের এই নয়া রুপই নব উপনিবেশবাদ হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে |


রাজনৈতিকগত ভাবে স্বাধীনতা লাভ করলেও তৃতীয় বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মূলত বিদেশি বহুজাতিক সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত| উন্নয়নশীল দেশের সরকার এই সংস্থাটির কাছে মূলধন ও কারিগরি বিদ্যার দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল| বাজার অর্থনীতি, GATT চুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো নতুন করে প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির উপনিবেশে পরিণত হচ্ছে| দ্রুত উন্নয়নের জন্য শিল্পন্নত রাষ্ট্রগুলির কাছ থেকে অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত সাহায্য লাভের বিনিময় উন্নয়নশীল দেশগুলি আপত্তিজনক শর্তাবলী মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে |

নব উপনিবেশবাদ হল রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হবার পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার এক প্রয়াস মাত্র| নব্য উপনিবেশবাদের কৌশলগুলি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাথে সাথে রাজনৈতিক, মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য হয়|

তার পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমগুলো সাহায্যে প্রাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও আদর্শ তৃতীয় বিশ্বের জনগণের কাছে পৌঁছে গিয়ে তাদের নিজস্ব ভাব-ধারনাকে প্রভাবিত করে চলেছে| ফলে নব উপনিবেশবাদ বা সনাতন উপনিবেশ উপনিবেশবাদের ধারণাগুলি থেকে অনেক বেশি ব্যাপক ও সংহার মুলক রূপ ধারণ করেছে|


তথ্যসূত্র

  1. Pavneet Singh, "International Relations".
  2. Ghosh Peu, "International Relations".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় উপনিবেশবাদের পতন তথা এর গুরুত্ব (আরো পড়ুন)
  2. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানির বিভাজন তথা বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাব  (আরো পড়ুন)
  3. ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণ  (আরো পড়ুন)
  4. GATT কি (আরো পড়ুন
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Previous Post Next Post

    মক টেস্ট

    ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে- Click Here

    সাহায্যের প্রয়োজন ?

    প্রশ্ন করুন- Click Here

    ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

    নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

    Delivered by FeedBurner