Tuesday, 23 October 2018

ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন অথবা working class movement in India হল একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর আলোচিত বিষয়| ভারতবর্ষে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কে চর্চা বিশেষ ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে| উত্তর ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্বার্থগত কারণে বিভিন্ন আন্দোলনে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে| এই আন্দোলনগুলোকে সাধারণভাবে এবং বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন আন্দোলন যেমন- পরিবেশ আন্দোলন এবং পুরনো আন্দোলন যেমন- কৃষক অথবা শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে| এই আন্দোলনগুলোকে মার্কসীয় অথবা অমার্কসীয় কাঠামোগত দিক থেকে আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| এই আলোচনাগুলিতে আন্দোলনগুলির প্রকৃতি, সমর্থনের ভিত্তি, নেতৃবর্গের কৌশল এবং কর্তৃপক্ষের প্রত্যুত্তর এবং সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়গুলি আলোচনা করা হয়েছে| আমরা আমাদের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় ভারতবর্ষের শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করব|

ভারতের-শ্রমিক-আন্দোলন-এর-সংক্ষিপ্ত-ইতিহাস

কারখানার শ্রমিক

শ্রমিক ঐতিহাসিকদের মতে ভারতবর্ষে শ্রমিক আন্দোলনের পরিধিকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, প্রথমটি ভাগটি হলো 1850-1890 খ্রিস্টাব্দ, দ্বিতীয় ভাগটি হল 1890-1918 খ্রিস্টাব্দ| তৃতীয় ভাগটি হল  1918-1947 খ্রিস্টাব্দ এবং শেষ চূড়ান্ত ভাগটি হলো স্বাধীনতার পরবর্তী অধ্যায়|

পূর্বের এবং সমকালীন ভারতবর্ষে শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব এবং বিভিন্ন দিক

ভারতবর্ষে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে থেকে কারখানা ও শিল্পের বিকাশ ও বৃদ্ধির ফলে শ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছিল| বিংশ শতকের শুরু থেকেই শ্রমিক শ্রেণী একটা আকৃতি পেতে শুরু করেছিল| ভারতবর্ষে শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা শক্ত| তবে 1931 খ্রিস্টাব্দে জনগণনার ভিত্তিতে N.M. Joshii হিসাব করে বলেছেন, ভারতে 50 মিলিয়ন শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সংগঠিত শিল্প কারখানাগুলোতে 10℅ শ্রমিকরা কাজ করতো| এর মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সুতো কলগুলিতে 1914 খ্রিস্টাব্দে নিযুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল 2.6 লক্ষ, পাট কারখানাগুলিতে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল 2 লক্ষ এবং রেলে শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল প্রায় 6 লক্ষ| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উৎপাদন শিল্প কারখানাগুলোতে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল 2 মিলিয়ন, রেলে 1.5 মিলিয়ন এবং ব্রিটিশ মালিকানাধীন বাগিচা ক্ষেত্রগুলিতে সংখ্যা ছিল 1.2 মিলিয়ন|

স্বাধীনতা লাভের পর এই সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল| এর মূলে ছিল আধুনিক উৎপাদনশীল বিভিন্ন কারখানার সম্প্রসারণ এবং সেইসঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, কার্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি| 1981 খ্রিস্টাব্দে জনগণনার হিসাব অনুসারে ভারতবর্ষে আধুনিক শিল্প কারখানাগুলিতে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল 2.5 মিলিয়ন এবং 1993 খ্রিস্টাব্দে কারখানাগুলিতে প্রতিদিন গড়ে কাজ করত 8.95 মিলিয়ন, খনিগুলিতে এর সংখ্যা ছিল 7.79 লক্ষ্য এবং বাগিচা ক্ষেত্রগুলিতে ছিল 10.84 লক্ষ্য|

স্বাধীনতার পূর্বে শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃতি সম্পর্কে কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষ্য করা যায়,

  • প্রথমত- পূর্বে শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠিত এবং অসংগঠিত এই দুটো শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল| এই বিভাগ বর্তমানে প্রচলিত আছে|
  • দ্বিতীয়ত- শ্রমিক শ্রেণী এবং কৃষক শ্রেণীর মধ্যে উপযুক্ত সীমারেখার অভাব আছে|
  • তৃতীয়ত- প্রথম দিকে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান সময় পর্যন্ত শ্রমিকশ্রেণী জাতি, ভাষা, গোষ্ঠী এবং শ্রেণীতে বিভক্ত আছে|
  • চতুর্থত- বর্তমানে সরকারি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে নিযুক্ত শ্রমিক শ্রেণী বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত আছে| যথা- M.N.C শ্রমিক এবং দেশীয় কোম্পানির শ্রমিক প্রভৃতি|
সাধারণভাবে দেখা যায় যে, সরকারি ক্ষেত্রে নিযুক্ত শ্রমিকরা বেসরকারি ক্ষেত্রে নিযুক্ত শ্রমিকদের চেয়ে অনেক বেশি কাজের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন|

প্রাক স্বাধীনতা যুগে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন

উনিশ শতকের শেষের দিকে মাদ্রাজে এবং বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বোম্বেতে সুসংগঠিত ভাবে শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল এবং সংগঠিত ভাবে প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল| তবে বোম্বেতে S.S. Bengali, বাংলাতে শশীপদ ব্যানার্জি এবং মহারাষ্ট্রে নারায়ন লাহান্ডে শ্রমিক স্বার্থরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন|

1885 খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলেও 1920 খ্রিস্টাব্দে ও তার কিছু পূর্ববর্তী সময়ের শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠন নিয়ে সুসংগঠিত চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল| উনিশ শতকের শেষের দিকে বোম্বে, সুরাট, আমেদাবাদ এবং অন্যান্য জায়গায় শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল| এই ধর্মঘটগুলি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত স্থানীয় এবং ক্ষণস্থায়ী| ধর্মঘটগুলির কারণ ছিল শ্রমিকদের মজুরি হ্রাস, বরখাস্ত, জরিমানা প্রভৃতি| এই ধরনের কার্যাবলী শ্রমিকশ্রেণীকে সুসংগঠিত হতে এবং শ্রেণি সচেতন হতে সাহায্য করেছিল|

দ্বিতীয়ভাগ: 1974 থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শ্রমিক শ্রেণী আন্দোলনের স্বতন্ত্র রূপে প্রত্যক্ষ করা যায়| এক্ষেত্রে 1920 এর দশক ছিল গুরুত্বপূর্ণ| প্রথমত, 1920-তে জাতীয় কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণীকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদেরকে সংযুক্ত করে| দ্বিতীয়ত, 1920 খ্রিস্টাব্দে প্রথম সর্বভারতীয় শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়| লাখান্ডে এবং তিলক মিলিতভাবে প্রতিষ্ঠা করেন A.I.T.U.C., তৃতীয়ত-এই সময় ভারতবর্ষে অনেকগুলি শ্রমিক ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়|

1929 খ্রিস্টাব্দে যদিও কিছু কংগ্রেসি A.I.T.U.C. গঠন করে ছিল| তবে এই সম্পর্কে 1920, 1922 এবং 1924 খ্রিস্টাব্দে ও 1930 খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় সমাবেশে এই সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল| 1929 খ্রিষ্টাব্দের পর কমিউনিস্টরা শ্রমিকদের ব্যাপারে যথার্থভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল WPP প্রতিষ্ঠার পর| WPP 1928 খ্রিস্টাব্দে বোম্বেতে এবং ভারতে অন্যান্য শহরে ধর্মঘট সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছিল| 1930-1935 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারিনি| কিন্তু 1930 খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে "United National Front" গঠনের পর থেকে শ্রমিক শ্রেণী একটা শক্তিশালী পাটাতন পায়|

বিশ্বযুদ্ধের পর শ্রমিক আন্দোলন পুনরায় সংগঠিত হতে দেখা যায়| বিংশ শতাব্দীর হলে ধর্মঘটের শতাব্দী| 1921 খ্রিষ্টাব্দের সরকারি হিসাব অনুযায়ী 396 টি ধর্মঘট হয়েছিল এবং এবং 6 লক্ষ শ্রমিক যোগদান করেছিল| 1928 খ্রিস্টাব্দে সমগ্র দেশে অসংখ্য ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়| বোম্বে ছাড়া কলকাতার পাটকলগুলিতে এবং পূর্ব রেলের পরপর ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়| 1930 খ্রিষ্টাব্দের পর মতপার্থক্যের কারণে A.I.T.U.C. বিভক্ত হয়ে যায় এবং গড়ে ওঠে A.T.U.F. 

1920 খ্রিষ্টাব্দের পর 1930-40 খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে শ্রমিক আন্দোলনে ভাটা আসে| এই সময় কমিউনিস্ট পরিচালিত সংগঠনগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে| 1934 খ্রিষ্টাব্দের পর পুনরায় শ্রমিক সংঘগুলি শক্তিশালী হতে দেখা যায়| এই সময় কাপড়ের কলগুলিতে, পাটকলগুলিতে এবং রেলে বেশ কতগুলি ধর্মঘট হতে দেখা যায়| 1935 খ্রিস্টাব্দে স্বীকৃত শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা ছিল 213 এবং তাদের সদস্য সংখ্যা ছিল 2,84918 জন| 1936 খ্রিস্টাব্দে শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা ছিল 241 টি|

1937 থেকে 1989 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শ্রমিক ধর্মঘটের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়| 1937 খ্রিস্টাব্দে শ্রমিক ধর্মঘটের সংখ্যা ছিল 379 টি এবং 1937 খ্রিস্টাব্দে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল 399 টি| এই সময়ে শ্রমিক আন্দোলনে দুটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়|প্রথমত, ধর্মঘটগুলি অসংখ্য ছোট ছোট শিল্প নগরগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল| দ্বিতীয়ত, এই সময়ে শ্রমিক আন্দোলনগুলি রক্ষামূলক না থেকে আক্রমনাত্মকমূলক হয়ে উঠেছিল| কেননা এই সময় থেকে তারা বেতন বৃদ্ধি, শ্রমিক সংগঠনের স্বীকৃতি, শ্রমিক শোষণ বন্ধ প্রভৃতি দাবি জানিয়েছিল| 1940 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আবার রক্ষামূলক হয়ে ওঠে| 1942 খ্রিস্টাব্দে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলে শ্রমিক আন্দোলন তুলনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে| এরপর 1942 থেকে 1947 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শ্রমিক আন্দোলনের আবার ভাটা আসে| এই সময় বিপুল পরিমাণ শ্রমিক ছাঁটাই এবং আয় হ্রাস পায়| এর ফলে 1947 খ্রিস্টাব্দে পুনরায় অনেকগুলো শ্রমিক ধর্মঘট হতে দেখা যায়|

         ...............................................................


Thank you so much for reading the full post. Hope you like this post. If you have any questions about this post, then please let us know via the comments below and definitely share the post for help others know.

Related Posts

0 Comments: