Wednesday, 17 October 2018

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী সুভাষচন্দ্র বসু এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অবদান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রক্রিয়া শুধুমাত্র ভারতের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না, ভারতের বাইরেও তা প্রানবন্ত হয়ে উঠেছিল| ভারতের অভ্যন্তরে যেমন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, তেমনি অন্যতম শীর্ষনেতা সুভাষচন্দ্র বসু  (subhash chandra bose) আজাদ হিন্দ ফৌজের মাধ্যমে ভারতের বাইরে থেকে এক অভাবনীয় সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করেছিল|

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার আগে থেকেই সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেসের আপস নীতির সমালোচনা করতে থাকেন| অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাটি "স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস" গ্রন্থি দেখিয়েছেন, সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে গান্ধীজীর বিরোধ শুধু মতাদর্শের জন্য নয়, ব্যক্তিত্বের জন্য| সুভাষচন্দ্রের মধ্যে গান্ধীজি দেখিয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বের প্রতি এক নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ| 1939 সালের এপ্রিল মাসে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন| তিনি চাইছিলেন বাইরে থেকে বিদেশী শক্তির সাহায্যে সশস্ত্র সংগ্রাম করে ব্রিটিশদের উৎখাত করা| 1941 সালের মার্চ মাসে সুভাষচন্দ্র ভারত থেকে গোপনে অন্তর্ধান করেন| তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানির পক্ষ ত্যাগ করে মিত্রপক্ষে যোগ দেয়| সুভাষচন্দ্র জার্মানি গিয়ে হিটলারের সঙ্গে দেখা করেন, কিন্তু বুঝতে পারেন ভারতের স্বাধীনতা জন্য হিটলার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা করবে না|

ভারতের-স্বাধীনতা-সংগ্রামী-সুভাষচন্দ্র বসু-এবং-ইন্ডিয়ান-ন্যাশনাল-আর্মির-অবদান

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী সুভাষচন্দ্র বসু

সুভাষ চন্দ্রের বিদেশে গমন এবং সিঙ্গাপুরে স্বাধীন আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা

সুভাষচন্দ্র চিন্তা করেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জাপানের সাহায্য পাওয়া যেতে পারে| ইতিমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের উত্থান ঘটেছিল| 1941 সালে ডিসেম্বর মাসে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাদলের পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিকারিক মোহন সিং সেপ্টেম্বর মাসে আই. এন. এ ( INA ) গঠন করেন| বিপ্লবী রাসবিহারী বসু তাকে এই কাজে সাহায্য করেন| 1943 সালে সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুরে উপস্থিত হয়ে আই. এন. এ- এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন| সুভাষচন্দ্র ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি তথা আজাদ হিন্দ ফৌজের শীর্ষ নির্দেশক হয়ে ওঠেন| মালয়, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি অঞ্চলে জাপানিদের হাতে বন্দি অসংখ্য ভারতীয় সৈন্য এতে যোগ দেয়| এতে ঝাঁসি ব্রিগেড, গান্ধী ব্রিগেড, আজাদ ব্রিগেড, নেহেরু ব্রিগেড ও সুভাষ ব্রিগেড ছিল| সুভাষচন্দ্র দায়িত্ব নেওয়ার পর সৈন্য সংখ্যা 13 হাজার থেকে 50 হাজার এসে পৌঁছায়| 1945 সালে নেতাজি সিঙ্গাপুরে স্বাধীন আজাদ হিন্দ সরকার স্থাপন করেন|

আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম ও সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্ব

নেতাজির নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাইরে থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করা| আজাদ হিন্দ সরকারের মূল ধ্বনি ছিল "জয় হিন্দ, দিল্লি চলো"| 1944 সালে জাপানি বাহিনী বার্মা জয় করে সেখান থেকে ভারতের দিকে এগিয়ে আসার সময় নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ তাদের সাথে ভারত অভিযানে যোগ দেয়| প্রথম থেকেই আজাদ হিন্দ ফৌজের অনেক রকম সামরিক প্রতিবন্ধকতা মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছিল| আজাদ হিন্দ ফৌজের নিজস্ব বিমান এবং সৈন্যদের হাতে আধুনিক অস্ত্র ছিল না| কোহিমা এবং ইম্ফল রণাঙ্গনে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে আজাদ হিন্দ ফৌজের তীব্র লড়াই চলে| আজাদ হিন্দ ফৌজ মনিপুরের রাজধানী ইম্ফল দখল করে নেই| কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট হয় এবং খাদ্য ও রসদ সরবরাহ ব্যাহত হতে থাকে| জাপানি সৈন্যরা পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়| 1944 সালে জুন মাসে আজাদ হিন্দ ফৌজ রণাঙ্গন থেকে সরে আসে|

সুভাষচন্দ্র বসু এবং বিমান দুর্ঘটনা

সামরিক বিপর্যয় সত্ত্বেও সুভাষচন্দ্র ঘোষণা করেন, উপযুক্ত সময় আবার আক্রমন শুরু হবে| এদিকে 1945 সালে জার্মানি আত্মসমর্পণ করে| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভারসাম্য স্বাভাবিকভাবে মিত্রশক্তির দিকে ঢলে পড়ে| কিছুদিন পর জাপানও আত্মসমর্পণ করে| এই পরিস্থিতিতে সুভাষচন্দ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাকা নিরাপদ মনে না করে টোকিও অভিমুখে রওনা হন| কথিত আছে টোকিও যাবার পথে বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু হয়, তবে এই ব্যাপারটি আজও রহস্যকৃত|

নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদান

আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্যর্থতা সামরিক কারণে অবশ্যম্ভাবী ছিল| অধ্যাপক সুমিত সরকারের মতে, 1944 সালে ব্রহ্ম রণাঙ্গন থেকে ভারত অভিযানের উপযোগী সময় ছিল না, কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রচন্ডভাবে মার্কিন-ইঙ্গ প্রতি আক্রমণ সৃষ্টি হয়েছিল| সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ শোনা যায় যে, তিনি নাকি ফ্যাসিবাদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন| এই প্রসঙ্গে বিপান চন্দ্র বলেছেন, কেবলমাত্র কৌশল হিসেবে সুভাষচন্দ্র ভারতের স্বাধীনতা লাভের জন্য ফ্যাসিবাদী শক্তির সহায়তা লাভের চেষ্টা করেন| বস্তুত সুভাষচন্দ্র ছিলেন একজন সর্বাত্মক বিপ্লবী এবং বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন রাজনীতিবিদ| 

আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম| ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদ হিন্দ বাহিনীর অবদান অস্বীকার করা যায় না| ব্রিটিশ সরকার আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈন্যের বিচার শুরু করলে ভারতীয় সৈন্য বাহিনী ও নৌবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের অফিসারদের বিচার শুরু হলে প্রতিবাদে উত্তাল গণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যে ঘটনাটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমবিকাশে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা|

এই উত্তাল গণ আন্দোলন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সৃষ্টিতে ধরা পড়েছে এইভাবে-

           "এই বিদ্রোহ কোনদিন দেখেনি কেউ 
             দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ"|

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে 1944 এর শেষ দিকে থেকে 1946 সালের জুলাই পর্যন্ত নজিরবিহীন, যখন ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ ও অবাধ্যতার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল| আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম ভারতীয় পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ব্রিটিশ আনুগত্যে ঘুণ ধরেছিল, যুব সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদ সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছিল| নৌবাহিনীতে প্রতিবাদে বিদ্রোহ ঘটে, ছাত্র এবং শ্রমিকরা কলকাতার রাস্তায় নেমে লড়াই করে| সুতরাং আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির সাথে যুক্ত হয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম এক সংগ্রামশীল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল|

              ............................................


Thank you so much for reading the full post. Hope you like this post. If you have any questions about this post, then please let us know via the comments below and definitely share the post for help others know.

Related Posts

0 Comments: