রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা এবং অবদান

আধুনিক ভারতের নির্মাতা হিসেবে রাজা রামমোহন রায় এর ভূমিকা ও অবদান নিয়ে ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত মহলে বিতর্কে শেষ নেই| কিশোরী চাঁদ মিত্র, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল প্রমুখ রাজা রামমোহন রায়কে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে তাঁকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়েছেন|

অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধী ভারতে এক নবযুগের প্রবর্তক হিসেবে তাঁর অবদান স্বীকার করে নিলেও মধ্যযুগের ধর্ম সংস্কারকদের সাথে তুলনা করে তাঁকে Pigmy বলে অভিহিত করেছেন| অন্যদিকে ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার রাজা রামমোহন রায়কে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন| সম্প্রতি ডেভিড কফ বলেছেন যে, "উনিশ শতকের নবজাগরণ কোন ব্যক্তি বিশেষের অবদান নয় এবং তাঁর অবদান নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়েছে"| রবীন্দ্রগুপ্ত, অধ্যাপক সুশোভন সরকার, সুমিত সরকার তাঁর কিছু চিন্তা ধারা প্রশংসা করলেও তাঁর মধ্যে স্ববিরোধিতা ও ব্রিটিশ শাসনের প্রতি এক মহাবিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করেছেন|

রাজা_রামমোহন_রায়ের_ভূমিকা_এবং_অবদান

Title-রাজা রামমোহন রায় 

Author-Atul Bose
Source - wikipedia (check here)
licence- creative commons
Modified- colour and background


রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে এই ধরনের পরস্পর বিরোধী অভিমত থেকে তাঁর যথাযথ ভাবমূর্তি তুলে ধরা খুব কঠিন কাজ| তাঁর নিজস্ব পরিমন্ডল ও তাঁর সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক জীবন, শ্রেণিচেতনা, সমকালীন ভারত এবং বিশ্বের পরিস্থিতি এইসব কিছুর কথা চিন্তা না করে তাঁকে বিচার করতে বসলে সে বিচার ভুল হতেই পারে|

ধর্মচিন্তা ও ধর্ম সংস্কার

ধর্ম চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি এতটাই উদার ছিলেন যে , যেকোন ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারে তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী| বস্তুত তাঁর মধ্যে সর্ব ধর্মের সমন্বয় এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দেখা দিয়েছিল| তিনি হিন্দু সমাজে প্রচলিত মূর্তিপূজা, জাতিভেদ প্রথা এবং অর্থহীন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিরোধিতা করেন| একেশ্বরবাদ সমর্থন করে তিনি পুস্তিকা রচনা করেন|

1829 সালে তিনি ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন, এর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্ম সংস্কার এবং একেশ্বরবাদের প্রচার| ধর্ম সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায়ের সবচেয়ে বড় অবদান হল খ্রিস্টান ধর্ম ও মিশনারিদের আক্রমণ থেকে হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করা এবং বাংলাদেশ বৈদান্তিক হিন্দু ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা|

রাজা_রামমোহন_রায়ের_ভূমিকা_এবং_অবদান
               মার্টিন লুথার


ঐতিহাসিক সুমিত সরকার এর ভাষায় মার্টিন লুথার(আরো পড়ুন) যেমন ইউরোপে দৃড়তার সাথে ধর্মসংস্কার আন্দোলন প্রতিষ্টিত করেন, রামমোহন কিন্তু তেমন পারেননি|


মানবতাবোধ ও সমাজ সংস্কার

গভীর মানবতাবোধ রামমোহনকে সমাজ সংস্কারে কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল| এক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হল সতীদাহ প্রথার(আরো পড়ুন) বিরুদ্ধে আন্দোলন| প্রধানত তারই প্রচেষ্টায় লর্ড বেন্টিংক 1829 সালে সতীদাহ প্রথা রদ করেন|

রাজা_রামমোহন_রায়ের_ভূমিকা_এবং_অবদান
Title-সতীদাহ প্রথা 
Author-Frederic Shoberl
Source - wikipedia (check here)
licence- creative commons
Modified- colour and background


অধ্যাপক দিলীপ কুমার বিশ্বাস বলেছেন যে, হিন্দু সমাজের মধ্যে এই প্রথার বিরুদ্ধে চেতনা সৃষ্টির জন্য রামমোহন তিনটি পদ্ধতি গ্রহণ করলেন- প্রথমত, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থ রচনা করে সতীদাহ প্রথাকে অশাস্ত্রীয় প্রমাণ করা| দ্বিতীয়ত, সংবাদপত্রের মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তোলা| তৃতীয়ত, স্বামীর চিতায় জীবন উৎসর্গের ইচ্ছুক নারীদের নিবৃত্ত করা|

নারীদের সম্পত্তির উপর অধিকারের জন্য আন্দোলন করেন| তিনি জাতিভেদ প্রথা এবং বহু বিবাহের বিরুদ্ধেও আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন|

আধুনিক শিক্ষার প্রসার 

আধুনিক শিক্ষার প্রসারের জন্য তাঁকে প্রতিকৃত বলা চলে| পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন প্রভৃতি আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে ভারতকে তিনি আধুনিক চিন্তাধারার সাথে পরিচিত করে তুলতে চেয়েছিলেন| তিনি হিন্দু কলেজ স্থাপনে ডেভিড হেয়ারকে নানাভাবে সাহায্য করেন|

1817 সালে কলিকাতায় একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন| শিক্ষার মাধ্যমে একটি পরিণত এবং যুক্তিবাদী মনের জন্ম ঘটুক, এটাই ছিল তার লক্ষ্য| বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার পথ তিনি দেখিয়েছেন, এই ক্ষেত্রে সংবাদ কৌমুদী পত্রিকাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য|

আবার অন্যদিকে জনৈক অধ্যাপক বলেছেন যে, তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রবর্তকের সম্মান হইত দেওয়া যায় না, কিন্তু বিতর্কের ভাষা হিসেবে তিনি যেভাবে বাংলা ভাষাকে গড়ে তুলেন তার উচ্চ প্রশংসার দাবি রাখে|


জাতীয়তাবাদের প্রসার

তিনি ছিলেন ভারতবর্ষে নবজাগ্রত জাতীয়তাবাদের প্রতীক| আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ(আরো পড়ুন) ও ফরাসি বিপ্লব তাকে গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল| ইংরেজ শাসনের প্রতি তাঁর আস্থা থাকলেও প্রয়োজনে তিনি ব্রিটিশ শাসনে সমালোচনা করেছেন|

তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমালোচনা করলেও কৃষকের দুর্দশার প্রতি তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন| প্রতিটি দেশের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন, যেমন- স্পেন ও পর্তুগালের আন্দোলনকে তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন|

অধ্যাপক বিপান চন্দ্রের মতে, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের এমন সুন্দর সংমিশ্রণ রামমোহন ছাড়া আর কারোও মধ্যে দেখা যায়নি, তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষে লিখিত একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, "Raja Ram Mohan Roy was the only person in his time  in the world to realise completely the significance of modern age."

আধুনিক ভারতের নির্মাতা হিসেবে তাঁর যুগান্তকারী অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতার সম্পর্কে যে বক্তব্য রেখেছেন তা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়| এমনকি নীলকর সাহেবদের অত্যাচার সম্পর্কে নীরব ছিলেন, যেমন নীরব ছিলেন ভারতের কুটির শিল্প ধ্বংস হবার বিষয়| তিনি ব্রাহ্মণের উপবীদ ধারণ করেছিলেন আজীবন, ইউরোপে গেলে তিনি ব্রাহ্মণ পাঁচক সঙ্গে নিয়ে যেতেন|

অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছেন, "রামমোহন অন্তত সচেতন সংস্কারক ছিলেন, বৈপ্লবিক পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন না| প্রচলিত রীতি-নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গণ-আন্দোলন সৃষ্টিতে বিশ্বাসী ছিলেন না"|

তাঁর আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং নিচু তলার মানুষকে তাঁর সংস্কার আন্দোলনের মূল ধারার সাথে সংযুক্ত করতে না পারা| তাঁর আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল একাডেমিক পথ ধরে| সাধারণ মানুষ এই ধরনের আন্দোলন বুঝে ওঠা সম্ভব ছিল না| সাধারণ মানুষের সাথে রামমোহনের তেমন সম্পর্ক ছিল না| তবে উনবিংশ শতকে নারী সংক্রান্ত সমস্যা(আরো পড়ুন) অথবা উনবিংশ শতকের তথাকথিত রেনেসাঁসের একটি বড় ত্রুটি ছিল, সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা|


তথ্যসূত্র

  1. সুমিত সরকার, "আধুনিক ভারতের ইতিহাস"
  2. Harihara Dasa, "The Indian renaissance and Raja Rammohan Roy".
  3. Sonali Bansal, "Modern Indian History".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|

              ......................................................

Your Reaction ?

Previous
Next Post »