থুসিডাইডিস এর ইতিহাস রচনার ধরন এবং তাঁর সমালোচনা

থুসিডাইডিসের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বহু সংখ্যক বক্তৃতা| বক্তৃতাগুলি তৎকালীন ইতিহাসে মনস্তাত্ত্বিক উপাদান জুগিয়েছে| এগুলির মধ্যে বাইরের দিক থেকে ব্যক্তিগত এবং অন্তরূপ দিক থেকে নৈব্যক্তিক আকারে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঘটনার গুঢ় উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে|

জে. বি. বিউরি বলেছেন, "লেখক এদের সাহায্যে একটি পরিমিতি এবং নেপথ্য অবস্থিত উদ্দেশ্য ও ভাবধারা ব্যাখ্যা করেছেন| কোন কোন ক্ষেত্রে এই বক্তৃতা লেখকের নিজস্ব মতামত প্রকাশের নাটকীয় ছদ্মবেশ মাত্র"

থুসিডাইডিস-এর-ইতিহাস-রচনার-ধরন-এবং-তার-সমালোচনা

Title-থুসিডাইডিস
Author-user:shakko
Date-2008
Source- wikipedia (check here)
Modified- colour and background
License- Creative commons 


থুসিডাইডিসের ইতিহাস রচনার ধরন

  1. তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে তার আপন সত্তাকে বিলুপ্ত করেছেন| ঐতিহাসিক কার্যকারণ পরম্পরার নির্দেশের তিনি সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী| তিনি ইতিহাসকে ব্যক্তিগত কাহিনীর অনুক্রম বলে ভাবিনি| ইতিহাসকে তিনি দেখেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হিসেবে|
  2. তিনি স্থান ও কালের মধ্যে সংকীর্ণ করে সত্যানুসন্ধানের ক্ষেত্রকে আয়ত্তের মধ্যে এনেছিলেন| তিনি তথ্য সংগ্রহের পর তাকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গ্রহণ করেছেন| ইতিহাস তাঁর কাছে কোন ধর্মগত অথবা দার্শনিক ভাবনার আশ্রয়স্থল নয়, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আধারের মতো তাঁর ইতিহাস যেন রাজনীতি এবং রাজনীতির বর্তমান ইতিহাস|
  3. তিনি বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাসের জনক বলে অভিহিত করা হয়| অধ্যাপক এম. জে. শরওয়েল থুসিডাইডিসকে নির্ভুল এবং সৎ ইতিহাস সৃষ্টির জনক বলে অভিহিত করেছেন| তিনি ছিলেন এমন লেখক যিনি ইতিহাসের শুদ্ধতা বিচারের পদ্ধতি শুরু করেন এবং তিনিই প্রথম ইতিহাসের কার্যকারণ দিকটিকে নির্দেশ করেন| 
  4. তিনি ইতিহাস রচনায় জিন বিদ্যার সম্পর্কিত বর্ণনাকে সংযুক্ত করেন| বিশেষ করে  গ্রীসের স্পার্টার এবং অন্যান্য শক্তির উদ্ভব ও বিকাশ এবং গ্রীক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠ- এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য| থুসিডাইডিসের পক্ষে এই কাজ করা ছিল খুব কঠিন, কেননা তিনি ছাড়া গ্রীসের আর কোন লেখকের ছিল না, যারা তথ্য এবং অলীক কাহিনীর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য করেনি| সুতরাং গ্রীক সমাজ এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে বংশগত ইতিহাস রচনার কাজ ছিল শক্ত|
  5. তিনি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে যে সমস্যার মুখোমুখি হন তা হলো পদ্ধতিগত সমস্যা| যার অর্থ হলো প্রভাবশালী পুরাবিদগণ ইতিহাসের উৎসগুলিকে এমন ভাবে উপস্থাপন করেছেন, যার থেকে সত্য এবং নিখুঁত তথ্য খুঁজে পাওয়া হতবুদ্ধিকর| তাই ইতিহাস রচনায় ছিল অন্তত শক্ত কাজ|
  6. তিনি হেরোডোটাস এর থেকে সাধারণভাবে নিজের ইতিহাস রচনারকে পৃথক করেছেন| প্রথমটি হলো-তিনি রাজনৈতিক চরিত্রের উপরে নির্ভর করে রাজনৈতিক ইতিহাস রচনা করেছেন| এছাড়াও তিনি বিভিন্ন নগর পরিসীমাগুরি ঘোষণার উপর নির্ভর করেছেন| এর ফলে থুসিডাইডিসের পক্ষে তুলনামুলকভাবে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অপেক্ষায় রাজনৈতিক ইতিহাস রচনা সহজ সাধ্য হয়েছিল| দ্বিতীয়টি হল- তিনি যতটা সম্ভব মৌখিক উপাদানকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন| বিশেষ করে তিনি প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার দ্বারা মৌখিক উপাদানকে পরিশুদ্ধ করেছেন| তিনি প্রথাগত উৎসসমূহকে ব্যবহার করেছেন এবং প্রথামুক্ত উৎসসমূহকে এড়িয়ে গেছেন|

থুসিডাইডিসের সমালোচনা

রাজনৈতিক ঐতিহাসিক হিসেবে তিনি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন সে সম্পর্কে আলোচনা এবং সমালোচনা করা হয়েছে| এই সত্যি যে, তিনি ছিলেন আবশ্যিকভাবে একজন ঐতিহাসিক যিনি রাজনীতিকে গ্রহণ করেছিলেন দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে|

তিনি এথেন্সের ইতিহাসকে বর্ণনা করেছেন একটা চরিত্র হিসেবে, একটা নেতৃত্ব হিসেবে এবং জাতির ঐতিহ্য হিসেবে| কিন্তু লেখক হিসেবে তিনি সময়ের ধারণাকে গ্রহণ করতে অক্ষম হয়েছেন অথবা তথ্য সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন| তিনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভৌগলিক বিষয় সম্পর্কে তিনি হিরোডোটাসের চিন্তাভাবনাকে মান্যতা দেননি|

তিনি ঐতিহাসিক ঘটনায় ভৌগলিক বিষয়ের প্রভাবকে হিরোডোটাসের মত গ্রহণ করেননি| তিনি ইতিহাসের ক্ষেত্রকে সমকালীন রাজনৈতিক অবস্থার শাখা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন| পাশাপাশি তিনি ইতিহাসকে দেশের বাহ্যিক সামরিক এবং কূটনৈতিক দশা হিসেবে নির্মাণ করেছেন তিনি ইতিহাসে শক্তি হিসাবে নির্মাণ করেছেন|

তিনি ইতিহাসের শক্তি হিসাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়ের প্রভাবকে উপেক্ষা করেছেন| তিনি এথেনীয় সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল দিকটিকে উপেক্ষা করেছেন এবং তিনি কেবলমাত্র পেলোপনেসীয় যুদ্ধের ইতিহাসকে বর্ণনা করেছেন|


উপসংহার 

এই যুদ্ধে তিনি একজন নাগরিক হিসেবে বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন| থুসিডাইডিস এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, যুদ্ধ হলো সমকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত|

সেই কারণে থুসিডাইডিসের রচনা বিজ্ঞানসম্মত হওয়া সত্ত্বেও এবং পদ্ধতিগত দিক থেকে সম্পূর্ণ হলেও ইতিহাসকে তিনি বিস্তারিত জ্ঞান এবং ভবিষ্যৎ ও বর্তমানে নীতি হিসাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলেন|

আর. জি. কলিংউড তার গ্রন্থ "The Idea of History" এর ভূমিকায় বলেছেন, ইতিহাস হল অনেকাংশেই বিজ্ঞানের মত কিন্তু দর্শনের ঘনিষ্ঠ| এখানে থুসিডাইডিস সম্পূর্ণভাবে হেরোডোটাসের গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন না, যা যথার্থ অর্থে ইতিহাসের ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়|


তথ্যসূত্র

  1. R. G. Collingwood, "The Idea of History".
  2. Frank Thilly, "A History of philosophy".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                .........................................


Previous Post Next Post