ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস

প্রতিটি সমাজের সাংস্কৃতিক গঠনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে| বিংশ শতাব্দীতে গণমাধ্যমের একটি অঙ্গ হিসাবে চলচ্চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল|

এর মধ্য দিয়ে কোন একটি সমাজ এবং সামাজিক অবস্থা ফুটে উঠে| পাশাপাশি বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে জনগণের বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো চলচ্চিত্র| তার পাশাপাশি সময়ের সাথে সাথে সমাজে যে সকল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় তাও এর মাধ্যমে আমাদের উপস্থাপন করা হয়|



চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক

চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির মধ্যে এক গভীর এবং জটিল সম্পর্ক বিদ্যমান| চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গণসংস্কৃতি প্রভাবিত হয় এবং জনগণের একটা বড় অংশ তাদের সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের প্রদর্শিত বিভিন্ন বিষয়গুলিকে অনুকরণ করে থাকে|

পাশাপাশি সময়ের সাথে সাথে জনগণের মধ্যে থাকা আশা-আকাঙ্ক্ষা এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে এবং এর মধ্য দিয়ে সমাজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থাও পরিলক্ষিত হতো| এই সকল কারণে চলচ্চিত্র এবং সংস্কৃতি এই দুটিকে কখনোই পৃথক করে দেখা সম্ভব নয়|



ঔপনিবেশিক ভারতের চলচ্চিত্রের নির্মাণ

ভারতের ঔপনিবেশিক আমল থেকে সংস্কৃতি চর্চার অঙ্গ হিসাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছিল| সংবাদপত্র, বেতার ইত্যাদি পাশাপাশি এটি গনমাধ্যমের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে গড়ে উঠেছিল|

ভারতীয়_চলচ্চিত্রের_ইতিহাস

বর্তমানে ভারতের মানচিত্র



আধুনিক বিশ্বে সাংস্কৃতিক চর্চার সামাজিক গুরুত্বের সাথে তাল মিলিয়ে ভারতেও চলচ্চিত্র চর্চা শুরু হয়েছিল| এটি কেবলমাত্র সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠেনি, সমাজের দর্পণ এবং পরিবর্তনের সংস্কৃতির মাধ্যম, ইতিহাসের উৎস ও বিষয় হিসাবে গুরুত্ব লাভ করেছে|

ঔপনিবেশিক ভারতে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম পর্বে মূলত ধর্মীয় কাহিনী তুলে ধরা এক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছিল| উল্লেখ্য যে, শুরু থেকে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত ভারতে "নির্বাক চলচ্চিত্র" প্রদর্শিত হতো| ইউরোপীয় সংস্কৃতির অনুসরণ করে এদেশে চলচ্চিত্রের পথ চলা শুরু হলেও বিষয়গুলি ছিল সম্পূর্ণভাবে ভারতীয়|

ভারতীয়_চলচ্চিত্রের_ইতিহাস

Title-দাদাসাহেব ফালকে
Date-7 October 2014, 16:12:41
Author - unknown
Source - wikipedia (check here)
Modified- colour and background


ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র 1896 সালে প্রদর্শিত হয়েছিল এবং সম্পূর্ণ ভারতীয় উদ্যোগে প্রথম যে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছিল সেটি হল "রাজা হরিশচন্দ্র" (1913) এবং এর নির্মাতা ছিলেন দাদাসাহেব ফালকে|

এই চলচ্চিত্র নির্মাণের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে তিনি 1918 সালে "শ্রীকৃষ্ণ জন্ম" নামক আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন| যার বিষয় ছিল ভারতীয় দেবতা হিসেবে পূজিত শ্রীকৃষ্ণের জন্মকে  ঘিরে গড়ে ওঠা এক প্রতিলৌকিক কাহিনী|

প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় জনজীবনে ধর্মের প্রভাব অনুভূত করে তিনি এই ধরনের সিনেমা নির্মাণে উৎসাহিত হয়েছিলেন| প্রকৃতপক্ষে দাদাসাহেব ফালকের হাত ধরে ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাণে "স্বদেশী করণ" ঘটেছিল| পাশাপাশি "রাজা হরিশচন্দ্র" সিনেমায় মূল চরিত্র রাজা হরিশচন্দ্রের সত্যবাদিতা পরবর্তীতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন এবং প্রতিপক্ষকে জয় করার ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠার কথা ব্যক্ত করেছিল|

সবাক চলচ্চিত্র

1936 সালে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র "আলম আরা" নির্মিত হয়| এক বছরে হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলেগু ভাষায় প্রায় 27 টি সিনেমা নির্মিত হয়| প্রথম থেকেই সবাক সিনেমাগুলিতে সংগীতের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়|

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্র হতে থাকে| জনগণের জীবনের সঙ্গে যে সকল সাহিত্য ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত, সেগুলিকে কেন্দ্র করেই চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে| এ প্রসঙ্গে "দেবদাস"(1935), "জীবন নাটক"(1942) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য|

এই সকল চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশ্রণ ঘটেছিল| পাশাপাশি জাতিরাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে গোষ্ঠীগত সচেতনতা ও কল্পিত সমাজ নির্মাণে এটি এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল| সবাক চলচ্চিত্র যুগে সংগীতের প্রাবল্য পরিলক্ষিত হত এবং পাশাপাশি গায়করাই এখানে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন|

1940 থেকে 1970 খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত বিভিন্ন সিনেমা

1940-50 দশকে যে সকল চলচ্চিত্রগুলি নির্মিত হয়েছিল, সেগুলির মধ্যে জাতীয়তাবাদের ছোয়া না থাকলেও দু-একটি ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়| এ প্রসঙ্গে 1948 সালে মুক্তিপ্রাপ্ত "শহীদ" সিনেমার নাম উল্লেখ করা যায়| 1943 সালে মুক্তিপ্রাপ্ত "কিসমত" সিনেমার দুটি গান জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যবহৃত হয়েছিল|

ভারতীয়_চলচ্চিত্রের_ইতিহাস


প্রথম যে পর্বে চলচ্চিত্রগুলিতে ধর্মীয় জীবনের কাহিনী বেশি করে তুলে ধরা হলেও 1950 সালে পরবর্তীকালের সিনেমায় সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল| এ পর্বে উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলি হল, মালায়লাম ভাষায় "জীবিতা নৌকা", এ চলচ্চিত্রে পারিবারিক জীবনের কথা উঠে এসেছিল| 1954 সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অপর এক মালায়লাম ছবি "নীলাক্কুইল" (The blue koel)- এ ভালোবাসার মাধ্যমে জাতিভেদ প্রথা ভাঙার কথা বলা হয়েছিল এবং দেখানো হয়েছিল যে, সামাজিক চাপের ফলে কিভাবে সে ভালোবাসার এক করুণ পরিণতি ঘটেছিল|

ভারতীয়_চলচ্চিত্রের_ইতিহাস


সত্যজিৎ রায়ের "পথের পাঁচালী" এবং "অপরাজিতা" এই দুটি সিনেমায় সাধারণ মানুষের জীবনের কথা বর্ণিত হয়েছে| আবার "দো বিঘা জমিন" সিনেমাতে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে এক প্রশ্ন চিহ্ন তুলে ধরা হয়েছিল| 1960 সালে পরবর্তীতে ইতিহাসকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে শুরু করে| "আনারকলি", "মোগল ই আজম", "মাদার ইন্ডিয়া" ইত্যাদি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইতিহাসকে তুলে ধরার প্রয়াস পরিলক্ষিত হলেও সিনেমাগুলিতে ঐতিহাসিক সত্যতা সেইভাবে পরিলক্ষিত হয়নি|

70 এর দশকে পরবর্তীতে "অঙ্কুর", "নিশান্ত", "মনন্থন", "জুনুন", "ভূমিকা" ইত্যাদি সিনেমাগুলিতে রাজনীতির ছোয়া ফুটে উঠে| আবার "আক্রোশ" সিনেমায় অশিক্ষিত আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রীয় শোষণের চিত্র ফুটে উঠেছে| National film development corporation - এর সহায়তায় পরবর্তীতে অনেকগুলি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়| এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, "মাইকেল", "The Idiot", "The making of the mahatma" প্রমূখ এই সকল সিনেমার মাধ্যমে ভারতীয় চলচ্চিত্র এক অন্য উচ্চতায় উঠে আসে|


সমান্তরাল সিনেমা অথবা Parallel cinema

70 এর দশকে শুরুতে মৃণাল সেন এবং শ্যাম বেনেগাল এর হাত ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক সমান্তরাল আন্দোলন(Parallel Movement) শুরু হয়েছিল| এই প্রসঙ্গে মৃণাল সেনের "ভুবন সোম"(1969) এবং শ্যাম বেনেগালের "অঙ্কুর"(1974) এর নাম উল্লেখযোগ্য|

এই সিনেমাগুলিতে তৎকালীন সময়কে তুলে ধরা হয়েছিল| উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, সত্যজিৎ রায়ের "শতরঞ্জ কি খিলাড়ি" সিনেমায় জমিদারি প্রথার ভাঙনের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন| এই ধরণের সিনেমাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য গুলি হল, "সংস্কার", "চক্র" প্রমুখ|


উপসংহার 

ভারতীয় চলচ্চিত্রে ভারতীয় সংস্কৃতিকে সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে| স্বাধীনতার পূর্ব কাল থেকে এই প্রবণতা ছিল বিদ্যমান| বর্তমানে ভারতবর্ষের সিনেমা ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহকে পরিণত হয়েছে|

পাশাপাশি চলচ্চিত্র বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাকে জনগণ তথা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে|


তথ্যসূত্র

  1. Renu Saran, "History of Indian Cinema".
  2. Satyajit Ray, "Deep Focus: Reflection On Indian Cinema".
  3. Ashish Rajadhyaksha, "Indian Cinema: A Very Short Introduction ".
  4. Jarek Kupsc, "History of Cinema for Beginners".
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|

              ......................................................

নবীনতর পূর্বতন
👉 Join Our Whatsapp Group- Click here 🙋‍♂️

    
  
  
    👉 Join our Facebook Group- Click here 🙋‍♂️
  


  

   
  
  
    👉 Like our Facebook Page- Click here 🙋‍♂️

    👉 অনলাইনে মক টেস্ট দিন- Click here 📝📖 

👉 আজকের দিনের ইতিহাস - Click here 🌐 🙋‍♂️

    
  
           

 Join Telegram... Family Members
  
     
                
                






টেলিগ্রামে যোগ দিন ... পরিবারের সদস্য









নীচের ভিডিওটি ক্লিক করে জেনে নিন আমাদের ওয়েবসাইটটির ইতিহাস সম্পর্কিত পরিসেবাগুলি


পরিক্ষা দেন

ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে এবং নিজেকে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুত করুন- Click Here

আমাদের প্রয়োজনীয় পরিসেবা ?

Click Here