নবজাগরণ বা রেনেসাঁ কাকে বলে এবং ইউরোপীয় সমাজের উপর এর প্রভাব

নবজাগরণ বা রেনেসাঁ শব্দটি সংকীর্ণ ও ব্যাপক অর্থে প্রযোজ্য হয়| ব্যাপক অর্থে নবজাগরণ বলতে সেই সকল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে বোঝায়, যা পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে এক অন্যান্য আধুনিকতা সূত্রপাত ঘটেছিল| সংকীর্ণ অর্থে নবজাগরণ বলতে বোঝায়, শিক্ষায় এক নতুন শ্রেণীর প্রকাশ| 

ফার্গুসনগ্রুঁনো নবজাগরণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, নবজাগরণের যুগ হলো আসলে একটা বিশৃঙ্খলা পরিবর্তনের যুগ| এই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল মধ্যযুগীয় স্থবিরতা এবং আধুনিক যুগের প্রতিষ্ঠা| এই যুগ হলো, আসলে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সেতু বন্ধন| কিন্তু তার সাথে এটাও মনে রাখতে হবে, এটা ছিল ব্যাপক অধিকার লাভের সংস্কৃতির মহান রাজনৈতিক আদর্শ পূরণের আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক ও বুদ্ধি ভাসিত সমন্বয়|

রেনেসাঁ_কাকে_বলে_এবং_ইউরোপীয়_সমাজের_উপর_এর_প্রভাব


নবজাগরণ হলো ইতিহাসের পুনর্জন্ম, যেটা ইতিহাসে সংস্কৃতি ও সভ্যতার পুনর্জাগরনের সূচক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়| বিখ্যাত গবেষক ও ইতিহাসবিদ সেভিল লিখেছেন, নবজাগরণ কেবলমাত্র মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, এটা ছিল বিশ্বব্যাপী আন্দোলন এবং যা মধ্যযুগের পরিসমাপ্তির পূর্বে সৃষ্টি হয়েছিল|

নবজাগরণ সমাজে মানুষের অবস্থানকে অনেক সাম্মানিক ও শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্টিত করেছিল| এর ফলে মানুষ নিজের ধর্ম ও ঐতিহ্যকে তাদের নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পালন করতে সমর্থ হয়েছিল| নবজাগরণ মানুষের মনে মানবতা ও জ্ঞানের অনুসন্ধিৎসা যুগিয়েছিল| এর ফলে মানুষ তার অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় পা রেখেছিল| 

এর সম্পর্কে জনৈক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন যে, "নবজাগরণ ছিল ইউরোপের এক যুগ সন্ধিক্ষণের আন্দোলন, যা মধ্যযুগের অনগ্রসর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, বস্তুবাদ, মুক্তি, আত্মবিকাশ, অধিক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং জাতীয়তাবাদের দিকে অগ্রসর হওয়া|




রেনেসাঁ  বা  নবজাগরণের সামাজিক ভিত্তি

ইউরোপীয়দের ভারত, আফ্রিকা ও আমেরিকার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠায় আবিষ্কৃত হয়েছিল নতুন নতুন সমুদ্রপথ এবং ইউরোপে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য নতুন রাষ্ট্র, যা ক্রমাগতভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল| আর এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র শিল্পপতি, সরকারি কর্মচারী, আইনজীবী, ডাক্তার ও শিক্ষকদের নিয়ে| 

এই শ্রেণীর জনগণ বিজ্ঞান, ইতিহাস, শিল্প ও অন্যান্য বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল| এই শিক্ষিত শ্রেণীর একটি বিশেষ সামাজিক অবস্থান অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো| যদিও শহরগুলির মাথায় ছিল কয়েকটি বণিক পরিবার, তবুও আইনজীবী ও শিক্ষকদের সামাজিক সম্মান ছিল বেশি| এই শিক্ষিত সামাজিক শ্রেণী নবজাগরণের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পটভূমিকা রচনা করেছিল|

মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা নবজাগরণের পটভূমি রচনাতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল| মধ্যযুগের সামন্ত প্রভুদের অবস্থা ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়| তারা নিজেদের দূর্গে বাস করত এবং শাসকরা তাদের ফিফ প্রদান করত| বিনিময়ে তারা যুদ্ধের সময় রাজাকে সৈন্য-সামন্ত দিয়ে সাহায্য করতো| মধ্যযুগের সামন্ত প্রভুরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতো, এর ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছিল| মধ্যযুগীয় পরিবর্তন থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক নতুন আলোকিত শতাব্দী|

রেনেসাঁ_কাকে_বলে_এবং_ইউরোপীয়_সমাজের_উপর_এর_প্রভাব

    চার্চ



মধ্যযুগে চার্চের প্রভাব ছিল সীমাহীন| ইউরোপের মানুষ চার্চের নির্দেশকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করত এবং গ্রহণ করত| এমনকি তৎকালীন রাজা চার্চের আদেশকে অমান্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না| কিন্তু পরবর্তীকালে কিছু শক্তিশালী রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার ফলে চার্চের সঙ্গে রাজাদের বিরোধ বাধতে শুরু করে| আসলে নবজাগরণের প্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল চার্চকে দুর্বল করে ফেলা| ফলে ইউরোপের সমাজ ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিকতার পথে পা বাড়িয়েছিল|




ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থার উপর এর প্রভাব

ইতালির রেনেসাঁর ঢেউ শুধু প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে(ফ্রান্স, দক্ষিণ জার্মানি প্রভৃতি) পড়েছিল তা নয়, অন্যান্য দেশগুলিকে এর প্রভাবে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল| এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছিল ইংল্যান্ডের উপর| থিওলজি বা ধর্মবিদ্যার মাধ্যমে স্পেনের নবজাগরণের চিন্তাধারা গভীর ভাবে প্রবেশ করেছিল| তবে যে দেশে এর প্রভাব বিশেষভাবে কার্যকরী হয়েছিল, সেখানে সমাজ জীবনে দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এক নতুন শ্রেণী- যারা রেনেসাঁর আদর্শকে মন থেকে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন|

ইংল্যান্ডের পর থেকে অন্যান্য দেশ এবং রেনেসাঁর আদর্শ গ্রহণকারী উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো এক নতুন সভ্য সমাজে পদার্পণ করেছিল| এই আদর্শ ভাবধারার মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডের শাসক শ্রেণী নিজেদের সামন্ততন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল|


স্যার থমাস মুর

এই সময় সম্ভবত বিখ্যাত মানবতাবাদী ছিলেন স্যার থমাস মুর|  তিনি ইংল্যান্ডের চ্যান্সেলর ছিলেন এবং এক উল্লেখযোগ্য লেখক হিসেবে সমাজে পরিচিত লাভ করে ছিলেন| 

তিনি ইরাসমাস ও ইতালির উল্লেখযোগ্য মানবতাবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন| তিনি গ্রীক ব্যাকরণ এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন| তিনি বিখ্যাত "ইউটোপিয়া"(1516) গ্রন্থের লেখক ছিলেন এবং রেনেসাঁর আদর্শকে স্বাগত জানিয়েছিলেন| 


উপসংহার

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে- বিভিন্ন আদর্শবাদী ব্যক্তি, রেনেসাঁর আদর্শ এবং মানবতাবাদীদের সুন্দর বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইউরোপীয় সমাজে এক নতুন সভ্যতার ডাক দিয়েছিল|


তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Jacob Burckhardt, "The Civilization of the Renaissance in Italy".
  3. Roberta J. M., "The Biography of the Object in Late Medieval and Renaissance Italy".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Ask questions :

    :

    --Click here:--

    Mock Test

    Visit our Mock Test Episodes - (click here)

    Share this post with your friends

    Need help..? send message privately.
    Previous
    Next Post »