সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক যুগসন্ধিক্ষণের বিতর্ক

চতুর্দশ শতকের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির সংকটের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক দিগন্তের যে সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল, তার ফলস্বরূপ সপ্তদশ শতকের ইউরোপীয় অর্থনীতিতে এক সার্বিক ব্যবস্থা হিসেবে একটি নির্দিষ্ট রূপ নিতে শুরু করে| সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ অদৃশ্য না হলেও ধনতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে লীন হয়ে যায়| 

পঞ্চদশ-সপ্তদশ শতকের সময়কালে সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে রুপান্তর হয়েছিল বলে এই সময়কে "সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক যুগের সন্ধিক্ষণের সময়" বলে মনে করা হয়| ঐতিহাসিক মহলে এই সন্ধিক্ষণকে ঘিরে একটি সুপরিচিত বিতর্ক রয়েছে| এই বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন মরিস. ডব, পল সুইজি, রডনি হিলটন, জাপানি অর্থনীতিবীদ টাকাহাসি, ইমানুয়েল ওয়ালেরমেটনরবার্ট ব্রেনার প্রমূখ পণ্ডিতগণ|

সামন্ততান্ত্রিক-ও-ধনতান্ত্রিক-যুগসন্ধিক্ষণের-বিতর্ক
কার্ল মার্কস 



কার্ল মার্কস ও তাঁহার সমাজতন্ত্রবাদ সম্পর্কীয়

ইতিহাসবিদদের মধ্যে যুগসন্ধিক্ষণের বিতর্কের দুটি স্তর রয়েছে- প্রথম স্তরের উপজীব্য সামন্ততন্ত্রের প্রকৃতি এবং তার অবসানের কারণ, দ্বিতীয় স্তরের উপজীব্য ইউরোপের ধনতন্ত্রের উত্থানের কারণ|

সাধারণত কাল মার্কসের উত্থান বিষয়ক অবস্থানকেই যুগসন্ধিক্ষণের বিতর্কের দ্বিতীয় পর্যায়ের যাবতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বলে ধরা হয়| 

মার্কস মনে করতেন, পুঁজিবাদের সূচনা হয়েছিল কৃষি ক্ষেত্রের উদ্বৃত্ত বানিজ্য বিনিয়োগের ফলস্বরূপ| তার মতে এই প্রক্রিয়ায় মূল কান্ডারী ছিলেন, কৃষি সমাজের অন্তর্গত বিত্তশালী কৃষক এবং নগরাঞ্চলের বণিক শ্রেণী|

তারা জমির ফলন এবং শিল্প পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে উভয় ক্ষেত্রে পুঁজি নিবেশ করতে সম্মত ছিলেন| বিনিয়োগ লাভজনক হবার সুবাদে এই প্রবণতা সমাজের বিভিন্ন স্তরে দাঁড়িয়ে পড়লে ধনতন্ত্রের উত্থানের পথ সুগম হয়|

মরিস. ডব 

ঐতিহাসিকদের মধ্যে মরিস. ডব প্রথম এই মার্কসীয় অবস্থানের ঐতিহাসিক রুপ দেন| ডবের মতে, চতুর্দশ শতকে খাজনার নগদীকরণ শুরু হলে খাজনা মেটানোর তাগিদে কৃষকরা তাদের উৎপাদনের একটা বড় অংশ নগদের বিনিময়ে বাজারে বিক্রি করতে শুরু করে|

সামন্ততান্ত্রিক-ও-ধনতান্ত্রিক-যুগসন্ধিক্ষণের-বিতর্ক
কৃষক


কৃষকদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজস্ব ফসল নিয়ে শহরের বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন, সেই বাণিজ্য থেকে যা মুনাফা হয় তা দিয়ে অন্যান্য গ্রামবাসী থেকে তাদের ফসলের একটা অংশ কিনে নিয়ে আবার বাজারে নিয়ে যেতেন- ডবের মতে এভাবেই সাধারণ কৃষক পুঁজিপতি কৃষকে ও বণিকে পরিণত হয়েছিলেন|

শহরের বণিক ও কৃষি পণ্যের সন্ধানে গ্রামে আসতেন ঠিকই, কিন্তু ডবের মতানুযায়ী ধনতন্ত্রের উত্থানে পুঁজিপতি কৃষকের ভূমিকা আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল| কারণ বিত্তশালী কৃষক কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে জমিতে লগ্নি করতে শুরু করেন| ডবের বক্তব্য অনুসারে ইউরোপের সর্বত্র ধনতন্ত্র সমান সার্বিক ব্যাপ্তি না পাবার অন্যতম কারণ পুঁজিবাদী কৃষকের উত্থানের উপাখ্যানের বিভিন্ন অভিঘাত| সামান্যতম বিষয়ে অল্পবিস্তর মতান্তর থাকলেও ডব কৃত এই ব্যাখ্যা পল সুইজি প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মোটের উপর এই ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছিলেন| 



রবার্ট ব্রেনার 

রবার্ট ব্রেনার একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দিয়ে ধনতন্ত্রের ডব কৃত সহমতের সমাপ্তি ঘোষণা করেন| অবশ্য ব্রেনারের মূল লক্ষ্য ডব ছিল না| ব্রেনারের উদ্দেশ্য ছিল মাইকেল পোস্তান ও ল্যরয় লাদুরির জনসংখ্যার কেন্দ্রিকতার তত্ত্বকে আক্রমণ করা| 

পোস্তান, ল্যরয় লাদুরির প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করতেন, পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে ইউরোপে জনসংখ্যার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেলে সেই বিপুল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে যেসব কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হয়, তারই পরিণাম ছিল ধনতন্ত্র| ব্রেনার প্রশ্ন তোলেন- পশ্চিম ইউরোপের প্রায় সর্বত্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলেও ধনতন্ত্র সর্বত্র সমান মাত্রায় কেন দেখা যায়নি| তার মতে, বিভিন্ন সমাজে ধনতন্ত্রের পথে উত্তোলনের অভিঘাত তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসের উপর নির্ভরশীল ছিল|

ব্রেনার মনে করতেন, ষোড়শ শতকের মূল্য বিপ্লবের ফলে পশ্চিম ইউরোপের সামন্ত প্রভুদের খাজনার চাহিদা বাড়তে থাকে| ফরাসি অভিজাত ভূস্বামী সম্প্রদায় তাদের খাজনার দাবি বাড়াতে সচেষ্ট হলে কৃষক শ্রেণী তার বিরোধিতা করে এবং রাজশক্তি কৃষক শ্রেণীকেই সমর্থন করে| ফলে কৃষি অর্থনীতিতে তাদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে ভূস্বামীরা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় সামন্ততান্ত্রিক বিভিন্ন কর পুনরায় আদায়ে সচেষ্ট হন| তাই ফ্রান্সে রাজস্ব, খাজনা ও সামন্ততান্ত্রিক কর সমূহের চাপে কৃষি সমাজে পুঁজিবাদের উন্মেষ ব্যাহত হয়| 


সামন্ততান্ত্রিক-ও-ধনতান্ত্রিক-যুগসন্ধিক্ষণের-বিতর্ক
কৃষি জমি


পক্ষান্তরে একই সমস্যার প্রেক্ষাপটে ইংল্যান্ডের সামন্ত প্রভুরা তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাদি জমি এবং সামাজিক উদ্বৃত্তের একটা বড় অংশ ভূস্বামী হবার সুবাদে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সফল হয়| কারণ কৃষি জমির মালিক বিত্তশালী কৃষকরা কৃষি সমাজে ভূস্বামীর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধিতে সচেষ্ট ছিলেন| ফলে ক্ষুদ্র কৃষক ও রাজ শক্তির বিরোধিতা তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি| এর ফলে ইংরেজ ভূস্বামী অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে এবং কৃষি ও বাণিজ্য লগ্নি করতে শুরু করেন| এই কারণেই ইংল্যান্ডে ধনতন্ত্রের উত্থানের পথ হয়েছিল অনেক বেশি প্রশস্ত|



গাইবোয়া ও রডনি হিলটন

গাইবোয়া, রডনি হিলটন প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা মোটের উপর ব্রেনারের সঙ্গে একমত| তবে উভয়েই এমন কিছু কিছু দিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যা ব্রেনার উপেক্ষা করেছিলেন| গাইবোয়া মনে করেন, ব্রেনার ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস আলোচনা করতে গিয়ে সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ছিলেন| তার মতে, সামন্তপ্রভুদের ইচ্ছামত খাজনা বাড়াবার পথে রাজশক্তি অন্তরায় হতে পেরেছিল, কারণ ফ্রান্সে সামন্ততান্ত্রিক আইন অনুসারে সামন্ত প্রভূর অর্থলিপ্সাকে প্রশমিত করা যেত| ফলে ফরাসি ভূস্বামী শ্রেণী অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়| ইংল্যান্ডের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে অপরিণত হওয়ায় ইংল্যান্ডের রাজশক্তির সেই সুবিধা ছিল না| সেই কারণে ইংল্যান্ডের ভূস্বামীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ ছিল|

হিলটন, ব্রেনার, ডব এবং গাইবোয়ার সঙ্গে একমত হলেও ইংল্যান্ডে ধনতন্ত্রের সূত্রপাত হবার জন্য অন্য আরেকটি কারণ উল্লেখ করেছেন| তার মতে, চতুর্দশ শতাব্দী পর থেকেই ইংল্যান্ডের মূল ভূখন্ডে যুদ্ধ না হওয়াটা অর্থনৈতিক প্রগতির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক| অন্যদিকে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের সময়কাল ইউরোপের ফরাসি ভূখণ্ড এবং ইউরোপীয় ভূখণ্ডের অন্যান্য দেশ একাধিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পটভূমি হবার ফলে আর্থ-সামাজিক কাঠামো এবং প্রক্রিয়া নিয়মিত বিপর্যস্ত হতে থাকে| প্রায়শই বাজার, কৃষিকাজ, পশু পালন এবং শিল্পের সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যাহত হয়| ফলে ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে যেমন নিরবিচ্ছন্ন অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু ফ্রান্স এবং ইউরোপের অন্যত্র তা হওয়া সম্ভব ছিল না|


তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Rodney Hilton, "The Transition from Feudalism to Capitalism".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Note: Email me for any questions:

    :-Click here:-.

    Note:- please share your feedback:

    :--Click here:--.

    Your Reaction ?

    Share this post with your friends

    please like the FB page and support us

    Previous
    Next Post »

    Top popular posts