নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতি

প্রত্নতত্ত্ববিদরা ভারতের প্রস্তর যুগে পুরাপ্রস্তর, মধ্যপ্রস্তর, নব্যপ্রস্তর- এই তিনটি পর্বে বিভক্ত করেছেন। ভারতের বিভিন্ন স্থানে নব্য প্রস্তর পর্বের আগমন ভিন্ন ভিন্ন সময় হয়েছে। কিলিগুল মোহাম্মদ পর্বের সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সময়ের মাঝামাঝি পর্বের দিকে।

আবার বেলুচিস্তানের মেহেরগড়ের এই পর্বে সূচনা হয় আনুমানিক ছয় হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে বা তারও কিছু পূর্বে। কাশ্মীরে নব্য প্রস্তর পর্বের আবির্ভাব হয়েছিল দুই হাজার চারশো খ্রিস্টপূর্ব। কাশ্মীরের পর্ব প্রায় নয় বছর স্থায়ী হয়েছিল।

ভারতীয় নব্য প্রস্তর সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য প্রত্নক্ষেত্র গুলি হল- বেলুচিস্তানে কিলিগুল মোহাম্মদ, মেহেরগড়, কাশ্মীরের বুর্জাহাম, বিহারের চিরান্দ, অন্ধ্রপ্রদেশের শাসকি, কর্ণাটকের তালুর এবং পোমপল্লীতে।

নব্য-প্রস্তর-যুগের-সংস্কৃতি



নব্য প্রস্তর যুগের বৈশিষ্ট্য

তবে এই প্রস্তর সংস্কৃতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সহজে আমাদের চোখে পড়ে, যথা-
  1. এই যুগের সব হাতিয়ার গুলির পাথরের এবং সেগুলি অ্যাগেট, কালোপ্লেট বা বেলেপাথর তৈরি হোক না কেন, সেগুলো ছিল মসৃণ। এই মসৃণ যুক্ত পাথরের হাতিয়ার পূর্বে কখনো দেখা যায়নি।
  2. মধ্য প্রস্তর যুগের কয়েকটি স্থানে পশুপালনের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু নব্য প্রস্তর যুগে মাঝামাঝি সময় থেকে কৃষিকাজের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়, যথা- ধান, গম এবং ডাল উৎপন্ন হতে থাকে। পরবর্তীকালে মেহেরগড়ে তুলার চাষ শুরু হয়। শুধু কার্পাশের ক্ষেত্রে নয়, এই উপমহাদেশে যব ও গমের চাষা-আবাদের প্রাচীনতম নিদর্শন এর উদ্দেশ্য ছিল মেহেরগড়। ধীরে ধীরে পশুপালন মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্থায়ী বাসস্থানেরর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভবঘুরের জীবনের অবসান ঘটতে থাকে। 
  3. এই যুগের হারে তৈরি হাতিয়ারের ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, যেমন- হারের সুচ, তীরের ফোলক, ছোড়া প্রভৃতির হাতিয়ার এই পর্বের বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে।
  4. মধ্য প্রস্তর যুগে কয়েকটি স্থানে মৃৎপাত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এই মৃৎপাত্রগুলি মানুষের উপযোগী চাহিদা মিটাতে বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিল।
  5. বয়ন শিল্প এই পর্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার।



নব্য প্রস্তর যুগের মানুষের জীবনযাত্রার পরিচয়

নব্যপ্রস্তরযুগ মানুষের যেমন পাহাড়ের গুহায় বসবাস করত, তেমনি বসবাসের জন্য চালাঘর নির্মাণ করেছিল। এইসব চালাঘর ছিল কাঠ, খুঁটি ও মাটির দেওয়াল নিয়ে গঠিত। আবার কখনো কখনো দেখা গেছে যে, তারা পাথরের উপর পাথর চাপিয়ে বসবাসের জায়গা নির্মাণ করতে পেরেছিল। নব্য প্রস্তর যুগে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে থেকে তামা ও ব্রোঞ্জের জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে। মনে করা হয় যে, এই যুগের শেষের দিকে মানুষ হয়তো ধাতুর ব্যবহার শিখেছিল, তবে তারা ধাতুর জিনিস তৈরি করতে পারত না।

নব্য-প্রস্তর-যুগের-সংস্কৃতি
চালাঘর

নব্য-প্রস্তর-যুগের-সংস্কৃতি
পাথরের উপর পাথর চাপিয়ে বসবাসের জায়গা



বেলুচিস্তানে কয়েকটি স্থানে পোড়ামাটির মাতৃকার দেবীর সন্ধান পাওয়া গেছে। নব্য প্রস্তর যুগের মানুষেরা এই দেবীর ও সাপের পূজা করত। সাপ মারা গেলে তার দেহ সমাধিস্থ করা হতো। অনেক সময় সমাধিস্থ মানুষের সাথে পশুর বিশেষ করে কুকুরের হাড় পাওয়া গেছে। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, মৃত প্রভুর সাথে কখনো তার প্রিয় পশুকে সমাধিস্থ করা হতো।

সুতরাং নব্য প্রস্তর যুগে সংস্কৃতির অগ্রগতি হয়েছিল। কৃষি ও পশুপালনের বিকাশ এবং মৃৎশিল্পে ও বয়ন শিল্পের সূচনায় মানুষ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। তাদের কাছে উন্নত হাতিয়ার না থাকার জন্য সর্বদাই এরা গভীর জঙ্গল এড়িয়ে চলত। ফলে পাথর পাওয়া যেত এমন সব স্থানে তারা বসবাস করত। তার সঙ্গে একথা ঠিক যে, সেসময় কৃষি বিকাশ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু উৎপাদন যা হত, তা প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত কিছুই থাকত না। তারা অনেকটাই মার্জিত হয়েছিল, কিন্তু সভ্য হয়নি। আবার তার সঙ্গে আমরা সার্বিক বিচারে বলতে পারি যে, তারা সভ্যতার দুয়ারে এসে পৌঁছেছিল একথা সত্য।



তথ্যসূত্র

  1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় "প্রাচীন ভারতের ইতিহাস" (প্রথম খন্ড)
  2. Poonam Dalal Dahiya, "Ancient and Medieval India".
  3. Upinder Singh, "A History of Ancient and Early Medieval India: From the Stone Age to the 12th Century".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. ঋক বৈদিক যুগ এবং পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্মীয় ভাবনা (আরো পড়ুন)
  2. বৈদিক এবং ঋক বৈদিক যুগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা (আরো পড়ুন)
  3. প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................


    অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো

    ইউটিউব চ্যানেল

    ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইব করে আমাদের সঙ্গে থাকুন- Click Here

    মক টেস্ট

    ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে- Click Here

    ফেসবুকের মাধ্যমে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

    Click Here

    আমাদের সঙ্গে ফেসবুক গ্রুপে থাকুন

    Click Here

    সাহায্যের প্রয়োজন ?

    প্রশ্ন করুন- Click Here

    ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

    নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

    Delivered by FeedBurner