রেনেসাঁর যুগে মানবতাবাদ

রেনেসাঁ বা নবজাগরণের কালে নতুন করে জীবনের যে জয়গান গাওয়া শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে নিহিত আছে আধুনিকতার উৎস| আধুনিক যুগের প্রারম্ভের চতুর্দশ শতকের ইতালিতে এবং পরে ষোড়শ শতকে পশ্চিম ইউরোপে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে যে ব্যাপক রূপান্তর শুরু হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসে তা হল আধুনিকতার প্রথম পদক্ষেপ| এই তিন দশক ধরে ইউরোপে মানব জীবন ও মানবিক সত্ত্বা সম্পর্কে এক নতুন চেতনার প্রসার ঘটেছিল| 

মানুষকে এক অসহায় জীব হিসাবে না দেখে তাকে সৃজনশীল ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে প্রয়াস আমরা চিন্তার ক্ষেত্রে দেখতে পাই, তাকেই সাধারণ অর্থে "মানবতাবাদ" বলা হয়ে থাকে| এই নতুন চেতনা সমাজ, শিক্ষা এবং রাষ্ট্র দর্শনের যেমন প্রতিভাত হয়েছিল, তেমনি রেনেসাঁ যুগে সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস, সংগীত, আইন, বিজ্ঞানচর্চা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও এই নতুন চেতনার স্বাক্ষর ছিল|

   রেনেসাঁর কেন্দ্রভূমি ফ্লোরেন্স



রেনেসাঁর এই মানবতাবাদী আন্দোলন হলো একটি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলন| ইরাসমাস, লেফেভরকোলেটমোরভিলিয়ন প্রমূখ ছিলেন ইউরোপের শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী| মানবতাবাদীদের মধ্যে সব বিষয়ই মিল ছিল না, কিন্তু তারা ভালো করে গ্রিক ও ল্যাটিন ধ্রুপদী সাহিত্যচর্চা করেন| সাহিত্য, ইতিহাসে, শিল্পকলা ও লেখায় তাঁরা পুরনো ইউরোপকে আহ্বান করে নতুন ইউরোপ করার বাসনায়|

এদের চিন্তাভাবনায় মানুষ হল- অনন্য, বিচিত্র তার অনুভূতি, সীমাহীন তার সম্ভাবনা| গ্রিক লেখক প্রোটোগোরাসকে অনুসরণ করে এরা ঘোষণা করেন যে, মানুষ হল সবকিছুর মাপকাঠি, এই মাপকাঠি দিয়ে তারা বিচার করেন| মানুষের অতীত ও বর্তমান, ঈশ্বর ও পরলোক নিয়ে এরা মাথা ঘামাতে চাইনি|


মানবতাবাদী আন্দোলনের জন্মভূমি হলো ইতালি| কালক্রমে অবশ্য তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল| ঐতিহাসিকরা মানবতাবাদী আন্দোলনের মধ্যে দুটি স্তর লক্ষ্য করেছেন- একটি হলো খ্রিস্টান মানবতাবাদ, অন্যটি হলো ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক মানবতাবাদ| নতুন মানবতাবাদী শিক্ষাকে খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে খ্রিস্টান মানবতাবাদ গঠনের চেষ্টা হয়েছিল| খ্রিস্টান মানবতাবাদ বিশ্বাস ও বুদ্ধির মধ্যে সামঞ্জস্য ঘটাতে চেয়েছিল| উত্তর ইউরোপের অনেক মানবতাবাদী এই ধারা অনুসরণ করে| এদের মধ্যে ছিলেন হল্যান্ডের ইরাসমাস, ফ্রান্সের রেবেলিয়াস, ইংল্যান্ডের কোলেট|

এই আন্দোলনের দ্বিতীয় স্তর অর্থাৎ নাগরিক মানবতাবাদ ইতালির নাগরিক জীবনের ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত| নিও প্লেটোবাদ দ্বারা প্রভাবিত ইতালির মানবতাবাদীরা মানব জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বাস্তববাদী অবস্থান নিয়ে ছিলেন| এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের দুটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো, নতুন ইতিহাস ও নতুন রাষ্ট্র তত্ত্ব| ম্যাকিয়াভেলি তাঁর "দ্য প্রিন্স" ও "ডিসকোর্সেস অন লিভাই" গ্রন্থে নতুন বাস্তববাদী রাজনীতির কথা বলেন| রাজনীতিতে নীতিকথা ও ধর্মের প্রভাব তিনি অস্বীকার করেন|


নবজাগরণের চিত্রকর এবং শিল্পীদের সৃজনশীল কর্মে ও মানবতাবাদী চেতনা মূর্ত হয়েছিলেন| সমকালীন চিত্রকর ও ঐতিহাসিক ভাসারি-এর আলোচনায় আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতকের শিল্পকলার ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় আঙ্গিক থেকে বেরিয়ে এসে এক মানবিক রূপান্তর| এই ধারা পূর্ণতা পেয়েছিল মাইকেলেঞ্জেলো সৃষ্টিতে| 16 শতকে ফরাসি মানবতাবাদীরা নবজাগরণের যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, তা আরো ব্যাপকভাবে শিল্পকলার গণ্ডি পেরিয়ে দর্শন ও নীতিশাস্ত্রে চর্চার ক্ষেত্রে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে|

নতুন করে মানবতা পণ্ডিতরা আবিষ্কার করেছিলেন, মানুষ ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি|   16 শতকে যে প্রতিবাদী ধর্ম খ্রিস্ট ধর্মের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, আর সেই ধর্মসংস্কার আন্দোলন ছিল মানবতাবাদী চেতনার এক বিশিষ্ট রূপ|


তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Jacob Burckhardt, "The Civilization of the Renaissance in Italy".
  3. Roberta J. M., "The Biography of the Object in Late Medieval and Renaissance Italy".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Note:- Please share your comment for this post :

    :

    --Click here:--

    .

    Share this post with your friends

    please like the FB page and support us

    Previous
    Next Post »

    Top popular posts