ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ইতিহাস ও গুরুত্ব

সামগ্রিক ইউরোপের ইতিহাসে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অবদানও কম ছিল না| আবার ঐতিহাসিকদের আলোচনাও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য| ইউরোপের ঐতিহাসিক, রাষ্ট্রনেতা এবং জনমতের প্রতিনিধিরা বলেছেন, এই যুদ্ধের আদৌ প্রয়োজন ছিল না| 

সমকালীন ফরাসি রাষ্ট্রনেতা বলেছেন যে, প্যালেস্টাইনের কতগুলি গুহার অধিকার নিয়ে এই বিরোধের বা যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল| কিন্তু ঠিক যে, এই যুদ্ধে আদৌ প্রয়োজন ছিল না| মনে করা হয় যে, কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানো যেত|

ক্রিমিয়ার-যুদ্ধের-ইতিহাস-ও-গুরুত্ব
ইউরোপের মানচিত্র




ক্রিমিয়ার যুদ্ধ হলো ইউরোপের ইতিহাসে বিভীষিকা| প্যালেস্টাইনের বাইরে ধর্মের স্থানগুলির উপর কর্তৃত্ব নিয়ে রোমান ক্যাথলিক এবং গোরা গ্রীক খ্রিস্টানদের বিরোধ বেধে ছিল| অনেককাল ধরে এই ধর্মীয় স্থানগুলির উপর গ্রীক খ্রিস্টানদের আধিপত্য ছিল| তৃতীয় নেপোলিয়ন তার ক্যাথলিক প্রজাদের খুশি করার জন্য এই ধর্মীয় স্থানগুলির উপর কর্তৃত্ব দাবি করেন| 


তুরস্কের সুলতান তার এই অনুরোধ রক্ষা করে ধর্মীয় স্থানগুলির ভার ক্যাথলিকদের হাতে অর্পণ করেন| এই ঘটনায় রাশিয়ার জার নিকোলাস অন্তত ক্ষুব্ধ হন| এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বোনাপার্টের ইঙ্গিত পাওয়া যায়| তিনি পুনরায় ধর্মীয় স্থানগুলির উপর গ্রীক খ্রিস্টানদের বিশেষ অধিকারের দাবি অর্পণ করার কথা বলেন| আর সেই সাথে আরেকটি দাবি উত্থাপন করেন- তুরস্কের বসবাসকারী গ্রীক খ্রিস্টানদের উপর রাশিয়ার কর্তৃত্ব বহাল থাকবে| তুরস্কের সুলতান তার এই দাবি মেনে না নিলে যার তার উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া দখল করলে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের(16 অক্টোবর, 1853 - 30 মার্চ, 1856) সূত্রপাত ঘটে|

ক্রিমিয়ার-যুদ্ধের-ইতিহাস-ও-গুরুত্ব
গির্জা



ঐতিহাসিকরা ধর্মীয় স্থানগুলির অধিকার নিয়ে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল, সেটিকে তারা সমর্থন করেনি| ঐতিহাসিকরা এই যুদ্ধের আসল কারণ বলতে গিয়ে বলেছেন- তুরস্কের প্রতি জার প্রথম নিকোলাসের আক্রমনাত্মক আগ্রাসী নীতি, ইংল্যান্ডের বৈদেশিক নীতিতে দ্বিধাগ্রস্ততা, ইংল্যান্ডের রুশ বিরুদ্ধে প্রবল জনমত এবং ফ্রান্সের নতুন ইউরোপীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস| আবার ঐতিহাসিক এ. জে. পি. টেলর বলেছেন, "রুশ বিরোধীতার আসল কারন ছিল রাশিয়ার পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস"|


ফলাফলের নিরিখে ডেভিড টমসন বলেছেন যে, "ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ছিল সম্ভবত অপ্রয়োজনীয়, নিষ্ফল, অর্থ ও সম্পদের অপচয়কারি"| তবে পরবর্তীকালে প্যারিস চুক্তির মধ্য দিয়ে কতগুলি বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল| এই যুদ্ধের ফলে পরাজিত রাশিয়া ইউরোপের সম্প্রসারণ ব্যাহত হয়েছিল এবং সামরিক দুর্বলতার নগ্ন রূপ প্রকাশ পেয়েছিল| তুরস্ক ইউরোপের ইতিহাস রুগ্ন মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল| রাশিয়ার পরাজয় বোনাপাট বংশের আহত অভিমানকে শান্ত করেছিল|

স্যার রবাট মোরিয়ার এর মতে, "ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ছিল বর্তমান কালের সংগঠিত সর্বাধিক অপ্রয়োজনীয় একটি যুদ্ধ"| এই মতটি আপাত দৃষ্টিতে সত্য বলে মনে হয়, কারণ এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল অতি নগ্ন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে| তাছাড়া এই যুদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় সমস্যার কোন সমাধান করতে পারেনি| রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ব্যাহত ছিল, আবার মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া সুযোগ পাওয়া মাত্রই স্বাধীন হয়েছিল|

অথচ অর্থ ক্ষয় ও জীবনহানির দিক থেকে এই যুদ্ধ কোন দিক থেকেই কম ছিল না| এই যুদ্ধে রাশিয়ার 3 লক্ষ, ফ্রান্সের 2 লক্ষ এবং ইংল্যান্ডের 30 হাজার সৈন্যের প্রাণহানি হয়েছিল|



তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Alexis Troubetzkoy, "A Brief History of the Crimean War".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »