ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান বিষয় হলো দুটি পরস্পর বিরোধী শক্তির সমাবেশ| একদিকে গণতন্ত্র এবং শান্তি রক্ষা স্থাপনের প্রচেষ্টা শুরু হয়, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকল্প রূপে একনায়কতন্ত্র শক্তিগুলি আত্মপ্রকাশ করে|

যুদ্ধ পরবর্তীকালে বিশের দশকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে যখন স্থিতিবস্থা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখার চেষ্টা চলছিল, তখন ইতালিতে ইউরোপের প্রথম একনায়কতন্ত্রী ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়| এই একনায়কতন্ত্র ব্যবস্থার রূপকার ছিলেন ইতালির ফ্যাসিস্ট দলের নেতা বেনিতো মুসোলিনি|


ইতালিতে-ফ্যাসিবাদের-উত্থানের-কারণ
ইতালির মানচিত্র




মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালিতে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রী ব্যবস্থার প্রবর্তন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না| অধ্যাপক এ.জি.পি. টেলর বলেছেন, জার্মানির মতো ইতালিতেও গণতন্ত্র ব্যবস্থার অনুকূল সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল না| রাশিয়ার কমিউনিজমের বিজয় এবং রুশ নেতৃত্বে সারা বিশ্বে কমিউনিজম প্রসারের প্রয়াস ইতালির পক্ষে ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়|

কমিউনিজম প্রসারের ভয় দক্ষিণ পন্থী সর্বগ্রাসী সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করেছিল| কিন্তু তা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের কাছে ইতালির আত্মসমর্পণ একমাত্র কারণ অথবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কমিউনিজমকে চিহ্নিত করা সঠিক নয়| অনেক কিছুর ফলশ্রুতি ছিল এই ফ্যাসিবাদ| যেমন, যুদ্ধোত্তর ইতালির সঙ্কটজনক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সমাজ জীবনের হতাশা, রাজনৈতিক শূন্যতা ইত্যাদি|

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালির বিপক্ষে না থাকলেও পরাজিত দেশগুলির মতোই ভার্সাই সন্ধির দ্বারা প্রতারিত হওয়ায় ক্ষুব্দ হয়েছিল| এছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে ইতালির আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠে| মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে, ফলে শ্রমিক আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠে| অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং জমি দখল করতে থাকে|

ইতালিতে-ফ্যাসিবাদের-উত্থানের-কারণ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

ইতালিতে-ফ্যাসিবাদের-উত্থানের-কারণ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ





এই পরিস্থিতিতে ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা দেখা যায়| 1919-1922 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইতালিতে পর্যায় ক্রমে 6 টি মন্ত্রিসভা কার্যকরী হয়, কিন্তু কোন দলের সংখ্যা গরিষ্ঠতা না থাকার ফলে কোন রাজনৈতিক দল স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি| রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্থায়িত্ব না পাওয়ার জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়| অপরদিকে সমাজতন্ত্রবাদ দ্রুত গতিতে প্রসার লাভ করতে থাকে| কারখানাগুলিতে শ্রমিক ধর্মঘটের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায় এবং দফায় দফায় শ্রমিকরা কলকারখানাগুলিতে দখল করতে থাকে| এই ফলশ্রুতি হিসেবে 1921 খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে ইতালিতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়|

শ্রমিক ও সমাজতন্ত্রের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিত্তবান ও পুঁজিপতি শ্রেণী আতঙ্কিত হয়ে ওঠে| কিভাবে ইতালিতে স্থায়ি শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে টিকিয়ে রাখা যায়, সে ব্যাপারে তারা চিন্তিত হয়ে উঠেন| মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তরাও স্থায়ি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন| পাশাপাশি সৈন্যবাহিনী এবং কর্মচ্যুত সেনাপ্রধানরা ইতালিতে নতুন সরকার গঠনের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েন|

ইতালির রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনের এই রকম অস্থিরতায় মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়| মুসোলিনি প্রথম জীবনে সমাজতন্ত্রের প্রতি গভীর আশা ছিল, কিন্তু তিনি গোড়া সোশালিস্ট হয়ে উঠতে পারেননি| ইতালির সংসদীয় নির্বাচনে ফ্যাসিবাদী দল আশাতীত সাফল্য লাভ করে| ক্রমে এই দলের সদস্য সংখ্যা 3 লক্ষ পৌছে যায়| বিত্তবান শ্রেণীর সমর্থনে ফ্যাসিবাদী দল শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করে|

অবশেষে মুসোলিনি তার ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে নিয়ে রোম অভিমুখে যাত্রা করলে দ্বিতীয় ইমানুয়েল মুসোলিনিকে মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানান|



তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Frank McDonough, "Conflict, Communism and Fascism".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »