ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব

ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে "Reign of Terror" বা "সন্ত্রাসের রাজত্ব" একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়| ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল একটি আপদকালীন কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক শাসন ব্যবস্থা বা কাঠামো| এই শাসন ব্যবস্থার মূলে ছিল দুটি ধারা, যথা- 1.বৈদেশিক ও 2.অভ্যন্তরীণ কারণ|


ফ্রান্সে-সন্ত্রাসের-রাজত্ব
ফ্রান্সের মানচিত্র


ফ্রান্সে বহু শিশু বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য ইউরোপীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলো একটি শক্তিজোট গঠন করে ফ্রান্স আক্রমণের প্রচেষ্টা করে| অপরদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থ সংকট ও যুদ্ধের প্রয়োজনে পর্যাপ্ত সামরিক বাহিনী যোগানের তাগিদে ফ্রান্সের জনগণকে অনুগত ও বাধ্য করার জন্য একটি কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা ফ্রান্সের ইতিহাসে "সন্ত্রাসের রাজত্ব" নামে পরিচিত|

ঐতিহাসিক ম্যাথিয়েজ বলেছেন, "সন্ত্রাসের শাসন ছিল সর্বহারা এবং অসমাপ্ত একনায়কতন্ত্র"| ঐতিহাসিক Georges Lefebvre বলেছেন, "সন্ত্রাসের শাসন ছিল শ্রেণী সংগ্রামের প্রকাশ, অর্থাৎ প্রতিবিপ্লবী এবং তাদের সমর্থক বিদেশী শক্তির হাত থেকে ফ্রান্সকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা"|

1791 খ্রিস্টাব্দে সংবিধান সভার পতনের পর ফ্রান্সে যে নতুন আইন সভা গঠিত হয়, তাতে তিনটি গোষ্ঠীর প্রাধান্য ছিল, যথা-
  1. রাজতন্ত্র সামরিক গোষ্ঠী, যারা কুইল্যান্ড নামে পরিচিত| এদের সদস্য সংখ্যা ছিল 264 জন| 
  2. চরমপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী গোষ্ঠী, যারা জ্যাকোবিন নামে পরিচিত| এদের সদস্য সংখ্যা ছিল 135 জন| 
  3. এই দুই এর মধ্যবর্তী স্থানে ছিল জিরন্ডিন, এদের সদস্য সংখ্যা ছিল 350 জন| 
জিরন্ডিন ও জ্যাকোবিনদের মধ্যে মতবাদ ছিল এই আইন সভার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য| জিরন্ডিনরা চাইছিল যে, ফরাসি সরকারের প্রাথমিক কাজ হওয়া উচিত বহিঃশত্রুর দমন, কিন্তু জ্যাকোবিনরা চাইছিল যে, প্রথমে অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবীদের দমন করতে হবে|

জ্যাকোবিনদের এই প্রস্তাবে কর্ণপাত না করে জিরন্ডিনরা ফ্রান্সে শত্রু অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন| 1792 খ্রিস্টাব্দে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সমস্ত সীমান্তে ফরাসি বাহিনী বিদেশি বাহিনীর কর্তৃক পর্যদুস্ত হয়েছিল| যুদ্ধ সংকটাপন্ন ফরাসি অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, এর ফলে সৃষ্টি হয় মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি| সাঁকুলেৎ সহ সমগ্রহ শহরের জনতা বিপ্লবী অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল|

1792 খ্রিস্টাব্দে 10ই আগস্ট মাসে মারাক্তক গণ-অভ্যুত্থান দেখা দেয় এবং বিপ্লবী জনতার চাপে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক Georges Lefebvre "দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব নামে" অভিহিত করেছেন| 1792 খ্রিস্টাব্দে 21শে সেপ্টেম্বর প্রথম প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়, যা "National Convention" নামে পরিচিত| কিন্তু Convention -এ দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে জিরন্ডিন ও জ্যাকোবিন দলের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ততর হতে থাকে| প্রথমত- সম্পত্তির সমবন্টন ও দ্বিতীয়- রাজার শাস্তি|

জ্যাকোবিনরা সমবন্টনের মধ্য দিয়ে সাম্য ভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জিরন্ডিনরা এর বিরোধিতা করেছিল| তাছাড়া জ্যাকোবিনরা মনে করত যে, রাজা ষোড়শ লুই এর পলায়ন প্রচেষ্টা বিশ্বাসঘাতকতার সামিল| তাই তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড| জিরন্ডিনরা এই ব্যাপারে বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি| 1793 খ্রিস্টাব্দে রাজা ষোড়শ লুইকে গিলোটিন যন্ত্রে হত্যা করা হয়|

ফ্রান্সে-সন্ত্রাসের-রাজত্ব
গিলোটিন


ইতিমধ্যে জিরন্ডিন নেতা ডুমুরিয়েজ পরাজিত হয়ে নেদারল্যান্ডে ফিরে আসেন| তিনি অষ্ট্রিয়ার পক্ষে যোগদান করে প্যারিস আক্রমণ করে একটি স্বৈরাচারী সরকার প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করেন, কিন্তু ফরাসি বাহিনীর বিরোধিতায় তিনি আবার শত্রুপক্ষে যোগদান করেন| জিরন্ডিন নেতার এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা প্যারিসের মানুষ ভালো চোখে দেখেননি, এরফলে জিরন্ডিন দলের জনপ্রিয়তা এরপর থেকে দ্রুত হ্রাস পায়/ পেতে শুরু করে|

জাতীয় কনভেনশনের অধিবেশনে জ্যাকোবিন সদস্য রোবসপিয়ের, দাঁত প্রমুখরা জিরন্ডিন সদস্যদের দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করেন| জাতীয় রক্ষাবাহিনী প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অঞ্চল দখল নেই| 1793 খ্রিস্টাব্দে 1লা জুন তারা লুই এর  প্রসাদ ঘিরে ফিরেন| হাজার হাজার সশস্ত্র ও নিরস্ত্র জনতা পরিবেষ্টিত কনভেনশনের অধিবেশন 2রা জুন সারাদিন ধরে চলেছিল| অধিবেশনে দুজন জিরন্ডিনর সদস্য এবং মন্ত্রীর বহিষ্কার ও গ্রেফতারের জন্য জ্যাকোবিনদের প্রস্তাব গৃহীত হবার পর ফ্রান্সে প্রতিষ্টিত হয় জ্যাকোবিন একনায়কতন্ত্র| ঐতিহাসিকরা এই যুগকে "সন্ত্রাসের যুগ" বলে চিহ্নিত করেছেন| 1793 খ্রিস্টাব্দে জুন থেকে 1794 খ্রিস্টাব্দে জুলাই পর্যন্ত ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলেছিল|


সন্ত্রাসের কার্যাবলী 

জ্যাকোবিন একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসের রাজত্বের সূত্রপাত ঘটেছিল| সেই রাজত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য কতগুলি শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল| জাতীয় কনভেনশনের যাবতীয় শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুটি কমিটির উপর-
  1. সাধারণ নিরাপত্তা কমিটি (Committee of General Security)
  2. গণ নিরাপত্তা কমিটি (Committee of Public Sefety)

সাধারণ নিরাপত্তা কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল 12 জন, এই সদস্যরা সন্দেহভাজন প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতেন এবং পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতেন| সাধারণ নিরাপত্তা কমিটির অধীনে একটি বিপ্লবী বিচারালয় গঠন করা হয়েছিল, সেই সময় গণ নিরাপত্তা  কমিটির তদারকিতে "সন্দেহভাজন ব্যক্তির আইন" প্রণীত হয়েছিল| এই আইন অনুসারে বিপ্লবী বিচারালয় প্রতিবিপ্লবীদের মৃত্যুদণ্ড দিতো| দণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিদের গিলোটিনে প্রাণ দিতে হয়েছিল|

ফ্রান্সে-সন্ত্রাসের-রাজত্ব
গিলোটিন


ক্রমেই সন্ত্রাস মহা সন্ত্রাসের রূপ ধারণ করে| প্যারিস শহরে বিপ্লবী বিচারালয় 2639 জনকে, ফ্রান্সে 17000 জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল| হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে তারা ফ্রান্সে সবর্ত্র বিভীষিকার সঞ্চার করেছিল| অনেকে মনে করেন, এটি ছিল "কসাই বৃত্তির ঘৃণ্য মহামারী"|

অবশেষে 1794 খ্রিস্টাব্দে 28 শে জুলাই রোবসপিয়ের গিলোটিনে দণ্ডিত করার মাধ্যমে সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে|



তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Frank McDonough, "Conflict, Communism and Fascism".
  3. George A Henty, "In the Reign of Terror".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Previous Post Next Post

    মক টেস্ট

    ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে- Click Here

    সাহায্যের প্রয়োজন ?

    প্রশ্ন করুন- Click Here

    Get Latest updated Via Email

    Enter your email address for last update:

    Delivered by FeedBurner