অবশিল্পায়ন বিতর্ক

ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রসারে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো ভারতের চিরাচরিত ঐতিহ্যগত কুটির শিল্পের ও হস্তশিল্পের ধ্বংস সাধন| বিশ্বের সভ্য সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী কারুশিল্পীদের দ্বারা নির্মিত শিল্প দ্রব্যের প্রভূত সমাদর ছিল|

ভারতে কারু শিল্পের উৎকর্ষতা কথা বিশ্ববাসী এককথায় স্বীকার করত| ইংরেজদের ভারত জয়ের পর এই কারুশিল্প ধীরে ধীরে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিল, ফলে স্বাভাবিকভাবে দেশীয় বাণিজ্যেরও যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছিল| 

ব্রিটেন থেকে আমদানিকৃত যন্ত্র নির্মিত উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রিক অনেক কম দামে বিক্রি করতো, ফলে ভারতীয় সভ্যগণ সেই সস্তা দ্রব্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল| এই প্রক্রিয়ায় ভারতীয় শিল্প দ্রব্য অসম প্রতিযোগিতায় সম্মুখীন হয় এবং সে তার বাজার হারায়| 

অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের ফলে অল্প ব্যয়ে প্রচুর দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদিত হয়, ফলে হস্তচালিত ভারতীয় তাঁত শিল্প প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারেনি| তাই সঙ্গত কারণে উনবিংশ শতকে ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসসাধন প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছিল| ঐতিহাসিকরা ভারতীয় শিল্পের এই ধ্বংস সাধনকে "Deindustrialization" বা "অবশিল্পায়ন" নামে অভিহিত করেছেন| কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন, "Deindustrialization" শব্দটির সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ হওয়া উচিত "শিল্পায়ন রোধ"|

অবশিল্পায়ন-বিতর্ক
হস্তশিল্প


এই অবশিল্পায়ন প্রসঙ্গে বহু ঐতিহাসিক ও জাতীয়তাবাদী লেখকরা বিস্তর আলোচনা করেছেন| তাই অবশিল্পায়ন কথাটি একটি বিতর্কিত রূপ পরিগ্রহ করেছে| অনেক ঐতিহাসিক অবশিল্পায়ন কথাটিকে "অবশিল্পায়ন বিতর্ক" বলে অভিহিত করেছেন| এই অবশিল্পায়ন বিতর্কে অংশ গ্রহণকারী লেখকগন যথা- দাদাভাই নওরোজি, রমেশচন্দ্র দত্ত, রজনী পাম দত্ত, অমিয় কুমার বাগচি, B. D বসু, ডেনিয়েল থর্নার, মরিস ডি মরিস প্রমূখ সর্বাপেক্ষা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছেন|

মার্কিন গবেষক মরিস ডি মরিস মতে, অবশিল্পায়নের পুরো ব্যবস্থাটি হলো ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের দ্বারা বহুল প্রচারিত একটি "myth" বা "নিছক অলীক কল্পনা"|

অবশিল্পায়নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী William Bolts 1772 খ্রিস্টাব্দে "Considerations on India Affairs" নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন| এই গ্রন্থে Bolts বলেছেন, "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া কারবারের ফলে ভারতে দরিদ্র হস্ত শিল্পীরা  আরও দরিদ্রতম হয়েছিল এবং বিশেষত তাঁতিদের সংস্থা প্রচুর পরিমাণ পেয়েছিল"|

এই সময় হাজার হাজার শিল্পী ও কারিগর তাদের পেশা পরিত্যাগ করে ভূমিকে তাদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল, ফলে ভূমির উপর অত্যাধিক চাপ পড়ে এবং ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়|

অবশিল্পায়ন-বিতর্ক
ব্রিটিশ পতাকা


R. C. Dutta তাঁর বিখ্যাত "Economic history of India" গ্রন্থে অবসানের জন্য ইংরেজদের শাসক গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনা করেছেন| পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী নেতারাও এই ধরনের মতবাদ প্রকাশ করেছেন| তাদের মতে, যদি কোন জাতীয়তাবাদী সরকার ক্ষমতাশীল থাকতো তবে ভারতীয় শিল্পের অকাল মৃত্যু ঘটতো না, একটি সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করে ভারতীয় শিল্পকে রক্ষা করার চেষ্টা করতেন|

রেলপথ প্রসারের পর ভারতীয় পন্য শিল্পে বিশেষ করে গ্রাম্য কারিগরদের হাতের কাজের দ্রব্যাদির উৎপাদনের ধ্বংস সাধন অন্তত দ্রুত গতিতে ঘটেছিল| ব্রিটেন জাত জন্য পণ্য বহু রেলপথের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামীণ বাজারেও পৌঁছে গিয়েছিল, ফলে গ্রাম্য কারিগর দ্বারা নির্মিত পণ্যের চাহিদা গ্রামের মানুষের কাছে আর ছিল না|

ব্রিটেনের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর বাজার দখল ছাড়াও ইংরেজ শক্তি ভারত বিজয়ের পর আরও একবার ভারতীয় শিল্পের ধ্বংস সাধন করেছিল| ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা জোর করে ভারতীয় কারিগরদের কাছে সস্তায় জিনিস কিনতো| তাছাড়া ভারতীয়দের ভয় দেখিয়ে কম মজুরির বিনিময়ে তারা এসব শিল্প দ্রব্য তৈরি করে নিজেদের ব্যবসা চালাতো| এইভাবে এক প্রকার বিধি নিয়মের বেড়াজালে ভারতীয় শিল্পের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে|

অবশিল্পায়ন-বিতর্ক
ব্রিটিশ সৈনিক
অবশিল্পায়ন-বিতর্ক
কফি


ভারতীয় শিল্প ধ্বংসের অপর এক উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল তুলা, চামড়া, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি হওয়ার ফলে দেশে কাঁচামালের অভাব দেখা দেয় এবং তার মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়| সেই ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড থেকে আসা শিল্প উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রীর দাম ছিল অপেক্ষাকৃত কম| এই অসম প্রতিযোগিতায় ভারতীয় তাঁতী ও হস্তশিল্পীরা সমস্যায় পড়ে এবং চারুশিল্পের সমৃদ্ধি ভারতীয় নগর ও গ্রামগুলি ধ্বংসের মুখে পড়ে|

সাম্প্রতিককালে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদেরা অবশিল্পায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন| যেমন আমেরিকার গবেষক গবেষক মরিস ডি মরিস "Indian economic and social history review" গ্রন্থে বলেছেন, উনিশ শতকে ভারতে অবশিল্পায়ন ঘটেনি| অধ্যাপক মরিসের যুক্তি হল, জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকরা আমদানি বৃদ্ধি মানেই অবশিল্পায়ন ভেবে ভুল করেছিল| তার মতে, শিল্প দ্রব্যের আমদানিতে যেমন দেশীয় শিল্পের ক্ষতি হতে পারে, তেমনি পণ্য শিল্পের বৃদ্ধি হতে পারে|

আবার অধ্যাপক ডেনিয়েল থর্নার তার "Land and labour in India" গ্রন্থে বলেছেন, অবশিল্পায়ন হয়তো হয়েছিল উনিশ শতকের গোড়ায়, কিন্তু তারপর ভারতে কল কারখানা গড়ে উঠেছিল এবং বিংশ শতকের অবশিল্পায়নের তেমন কোন প্রমান নেই|

জার্মানি গবেষক তরু মাৎসুই মরিস ও থর্নার এর যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে বলেছেন, অবশিল্পায়ন অবশ্যই ভারতীয় কারিগরদের অবস্থা খারাপ করেছিল| তার মতে, উপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়ন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা| আবার অর্থনীতিবিদ অমিয় কুমার বাগচি তার "deindustrialization in gangetic Bihar(1809-1901)" প্রবন্ধ লিখেছেন, এই সময়ে শিল্পের উপর নির্ভরশীল জনসংখ্যার হার 18℅ থেকে 8℅ নেমে এসেছিল ও তাঁতিদের সংখ্যার দ্রুত হারে কমে গিয়েছিল|

সুতরাং এই অবস্থানের উপর দাঁড়িয়ে মরিস ও থর্নার যাই বলুক না কেন আধুনিক ভারতের ইতিহাসে অবশিল্পায়ন ছিল একটি বাস্তব ও সত্য ঘটনা| কাজেই অবশিল্পায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করে রমেশচন্দ্র দত্ত ঊনবিংশ শতাব্দী জাতীয়তাবাদী লেখকদের সমর্থনে বলেছেন, তাদের অবশিল্পায়নের ধারণাটি আদৌ কোনো ভুল ধারণা নয়| সর্বোপরি সব্যসাচী ভট্টাচার্য, তপন রায়চৌধুরী, বিপান চন্দ্র কেউই মরিসের বক্তব্য গ্রহণের রাজি নন| তাদের মতে, অবশিল্পায়ন একটি বাস্তব ও সত্য ঘটনা|



তথ্যসূত্র

  1. সুমিত সরকার, "আধুনিক ভারত"
  2. শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, "পলাশি থেকে পার্টিশন"
  3. Ishita Banerjee-Dube, "A History of Modern India".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. ভারতের অবশিল্পায়ন এবং এর পদ্ধতি, কারণ এবং ফলাফল (আরো পড়ুন)
  2. অবশিল্পায়ন কাকে বলে (আরো পড়ুন)
  3. সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব এবং এটি কিভাবে বাংলার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল  (আরো পড়ুন)
  4. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Previous Post Next Post

    মক টেস্ট

    ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে- Click Here

    সাহায্যের প্রয়োজন ?

    প্রশ্ন করুন- Click Here

    ফেসবুকের মাধ্যমে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

    our Facebook page- Click Here

    Our Facebook Group- Click Here

    ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

    নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

    Delivered by FeedBurner