আইন অমান্য আন্দোলনের উদ্দেশ্য, কর্মসূচি ও বৈশিষ্ট্য

1920 খ্রিস্টাব্দে 4-16 ফেব্রুয়ারি সবরমতী আশ্রমে কংগ্রেসের কার্য নির্বাহী কমিটির বৈঠকে আইন অমান্য আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়|

আইন-অমান্য-আন্দোলন
গান্ধীজী
আইন-অমান্য-আন্দোলন



আইন অমান্য আন্দোলনের উদ্দেশ্য

আইন অমান্য আন্দোলনের উদ্দেশ্যগুলি হচ্ছে,
  1. পূর্ণ স্বরাজ অর্জন, ভারতীয় যুবকদের বিপ্লবী আন্দোলন, সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষের ফলে অগ্নিগর্ভ ব্যবস্থার জন্যই কংগ্রেসের নতুন নেতারা পূর্ণ স্বরাজ অর্জনে লক্ষ্য স্থির করে| মাদ্রাজ অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি পেশ করা হলেও গান্ধীজী কিন্তু নেহেরু রিপোর্ট উল্লেখিত ডোমিনিয়ন সরকার পক্ষে ছিলেন| গান্ধীজী বলেন, ডোমিনিয়ন সরকার ও পূর্ণ স্বাধীনতার মধ্যে পার্থক্য নেই| যখন বড়লাট ডোমিনিয়ন দিতে অক্ষমতার প্রকাশ করেন, তখন কিন্তু 31 শে ডিসেম্বর গান্ধীজী পূর্ণ স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেন|
  2. লবণ আইন ভঙ্গ করা, কংগ্রেস গান্ধীজিকে আন্দোলনের দায়িত্ব দিয়ে দিলে গান্ধীজী সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নতুন কৌশল স্থায়ী করলেন| ভারতের কোটি কোটি মানুষ সমুদ্রে জল শুকিয়ে লবণ তৈরি করে এবং লবণ দিয়ে আহা তৈরির করতো সমস্ত মানুষ| ভারতের ব্রিটিশ সরকার ভারতবাসির লবণ তৈরির অধিকার কেড়ে নিয়েছিল|জল বাদ দিয়ে লবণের উপর কর নিয়ে সরকার ভারতবাসীকে শোষন করতো| গান্ধীজী লবণ আইন ভঙ্গ করে ব্রিটিশ সরকারকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে, তাদের তৈরি আইন আর ভারতবাসী মানতে রাজি নন|
  3. বিপ্লবী হিংসাশ্রয়ী আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করা, গান্ধীজীর আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, যাতে হিংসার রাজনীতি না করে তার জন্য বিপ্লবী আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করা|
  4. পূর্ণ স্বাধীনতার মাধ্যমে সমাজে ঐক্য স্থাপন, অধ্যাপক সুমিত সরকার বলেছেন, কৃষকদের কর দিতে বারণ করা হলে জমিদাররা দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে| এই ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতাবাদ যাতে জেগে উঠতে না পারে তার জন্য গ্রামের সমস্যার সঙ্গে লবণ আইন ভঙ্গের প্রশ্নকে জড়িয়ে দিয়ে একতা স্থাপন করতে চাইলেন গান্ধীজী|
  5. সমস্ত শ্রেনীর মানুষের স্বার্থ বহন করা, গান্ধীজির আন্দোলনের আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্ত শ্রেনীর মানুষের স্বার্থ বহন করা| এই জন্য তিনি 11 দফা দাবি পেশ করে বলেন- a.মাদক দ্রব্য বর্জন, b.লবণ কর বিলোপ, c.ভূমি রাজস্বের 50℅ কমানো, d.উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বেতন 50℅ বা তার বেশি হ্রাস, e.টাকার সাথে পাউন্ডের বিনিময় হারকে এক মিলিয়ে চারপাশে কমিয়ে আনা, f.বিদেশি বস্ত্রের উপর শুল্ক চাপানো, g.বৈদেশিক বাণিজ্যের মুক্তি, h.গোয়েন্দা বিভাগ তুলে দেওয়া, i.আত্মরক্ষার্থে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া| অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছেন, এটা আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে গরিব সামন্ত শ্রেণীর মানুষের স্বার্থরক্ষার ফলে তাদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা| সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে গান্ধীজী আন্দোলন করতে চেয়েছিলে| এই জন্য তিনি 21 দিন অনশন করেন, এমনকি তিনি হরিজনদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন এবং পূর্ণ স্বাধীনতা আইনের জন্য সমস্ত শ্রেনীর মানুষকে কাছে পেতে চেয়েছিলেন|
  6. বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন কৌশল, অধ্যাপক সুমিত সরকার বলেন, যখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী গোষ্ঠী তীব্র আন্দোলন করছে, তখন গান্ধীজী আইন অমান্য আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের মানুষের মনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চান|

আইন অমান্য আন্দোলনের কর্মসূচি

অধ্যাপক জুডিথ ব্রাউন বলেছেন, গান্ধীজীর কোন নির্দিষ্ট কর্মসূচি ছিল না, বরং বড়লাট আরউইন এর সঙ্গে চুক্তি করে কর্মসূচি পরিবর্তন করলেন| আবার অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছেন, মুক্তি আন্দোলনের প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করেন, এটা তার রণকৌশল| ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় 27 শে ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন, এগুলি হল-
  1. সবরমতী আশ্রম থেকে অনুগামীদের নিয়ে পায়ে হেঁটে ডান্ডিতে উপস্থিত হয়ে লবণ আইন ভঙ্গ করা, লবণ কর না দেওয়া, সরকারি আইন অমান্য করা|
  2. শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গান্ধীজী কৃষকদের কর না দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়| 
  3. সমগ্র ভারতে সভা ও সমিতি করে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের অঙ্গীকার করা| 
  4. বিদেশি পণ্য-বস্ত্র বয়কট করা|
  5. গ্রামাঞ্চলের গঠন মূলক কাজ করা| 
  6. সমস্ত ভারতীয়দের সরকারি পদ এবং আইনসভা থেকে পদ ভাগ করা|
বলা যেতে পারে, সুভাষচন্দ্র বসু ধর্মঘট করার প্রস্তাব দিলে গান্ধীজী প্রস্তাব গ্রহণ করেনি এবং তিনি গণ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন না| গান্ধী-আরউইন চুক্তিতে গান্ধীজী বিদেশী পণ্যের বয়কট রাজনৈতিক অস্ত্র রূপে প্রয়োগ করা হবে না, পুলিশি নির্যাতন নিয়ে অনুসন্ধান হবে না- এসব সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন|

আইন-অমান্য-আন্দোলন

আইন-অমান্য-আন্দোলন
সুভাষচন্দ্র বসু 
আইন-অমান্য-আন্দোলন
ব্রিটিশ পতাকা


আইন অমান্য আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

জুডিথ ব্রাউন বলেন, আইন অমান্য আন্দোলনের নির্দিষ্ট কর্মসূচি ছিল না| মুসলিম ও শিল্পপতিরা লোকালয়ে যুক্ত হয়নি| অধ্যাপক সুমিত সরকার বলেছেন, গান্ধীজী গণ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন না এবং গান্ধী-আরউইন চুক্তির অর্থ হচ্ছে পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষ থেকে পিছু হেঁটে আসা|

ব্রিটিশ সরকারের চরম দমননীতির জন্য নিরস্ত্র আন্দোলনকারীরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ছিলেন, কমিউনিস্ট ও শ্রমিকরা আন্দোলনে যুক্ত হয়নি| 1934 খ্রিস্টাব্দে 8 ই মে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন| এরফলে আইন অমান্য আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল|

তবে এই আন্দোলন কিন্তু একেবারেই নি:সফলা ছিল না| যেমন- ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লবণ আইন ভঙ্গ করা হয়, বিলিতি দ্রব্য পড়ানো হয়, কৃষকরা কর দেওয়া বন্ধ করে, অফিস-আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে পিকেটিং করা হয়, নারী আন্দোলন যুক্ত হয়, শ্রমিক এবং যুক্তিবাদীরা এগিয়ে না এলেও ব্যবসায়ী এবং কৃষকরা গান্ধীজীর আহবানে সাড়া দিয়েছিল|

পরিশেষে অধ্যাপক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের ভাষায় বলা যায়, এই আন্দোলন বিশ্ববাসীর সামনে ব্রিটিশ শাসনের স্বরূপ তুলে ধরে ব্রিটিশ সরকারের মর্যাদা খর্ব করা হয়েছিল|



তথ্যসূত্র

  1. সুমিত সরকার, "আধুনিক ভারতের ইতিহাস"
  2. Rajiv Ahir I.P.S, "A Brief History Of Modern India".
  3. Sonali Bansal, "Modern Indian History".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি (আরো পড়ুন)
  2. ক্রিপস মিশন ব্যর্থতার কারণ (আরো পড়ুন)
  3. সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব এবং এটি কিভাবে বাংলার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল  (আরো পড়ুন)
  4. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Note:- Please share your comment for this post :

    :

    --Click here:--

    Mock Test

    Visit our Mock Test Episodes - (click here)

    Share this post with your friends

    please like the FB page and support us

    Previous
    Next Post »