গিয়াসউদ্দিন বলবনের কৃতিত্ব ও রাজতান্ত্রিক আদর্শ

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের শাসনকাল সুলতানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়| সাফল্যের সঙ্গে বহিঃশত্রুর আক্রমণ মোকাবেলা করে এবং আমির ওমরাহদের ক্ষমতা খর্ব করে বলবন রাজতন্ত্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন| সামরিক বাহিনীর শক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি কেন্দ্রীভূত শাসন কাঠামো তার আমলেই গড়ে ওঠে|

গিয়াসউদ্দিন-বলবনের-কৃতিত্ব-ও-রাজতান্ত্রিক-আদর্শ



ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পরবর্তী 30 বছর তুর্কি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছিল| রাজ্য কোষের অর্থাভাব, আমির ওমরাহদের ষড়যন্ত্র ও স্বার্থনেশি মনোভাবের জন্য রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ছিল না বললেই চলে| কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বলতার সুযোগে সূচনা করেছিল ভয়ঙ্কর মোঙ্গল আক্রমণ| সৃষ্টি হয়েছিল চরম অরাজকতা এবং রাষ্ট্রের মর্যাদা বিনষ্ট হয়েছিল| তাই বলবন প্রথম থেকে রাজতন্ত্রের মর্যাদা ও সুলতানি শক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন|

রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বলবন পারস্যের সাসানীয় বংশের অনুকরণে তার নরপতিত্বের আদর্শ প্রচার করেন| রাজপদকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য নিজেকে "নায়েব-ঈ-খুদায়" অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে ঘোষণা করেন|

রাজার ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রসঙ্গে বলবন একদা তার পুত্র বুখরা খাঁকে বলেছিলেন, "নরপতির হৃদয় ঈশ্বরের বিশেষ বিশেষ অনুগ্রহের আধার এবং এই দিক থেকে তার সমকক্ষ মানবজাতির মধ্যে কেউ নেই"| তিনি মনে করতেন, জনসাধারণ বা আমির ওমরাহদের ইচ্ছায় সিংহাসনে বসেননি| ঈশ্বর আর্দিষ্ট পুরুষ হিসাবে তার কাজকর্মকে সমালোচনা করার অধিকার মর্ত্যলোকের কারোর নেই| তিনি তার এই স্বর্গীয় ক্ষমতার দাবি জোরালো করার জন্য খলিফার ফরমান সংগ্রহ করেন|


রাজার স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রাখার জন্য তিনি নিজেকে উচ্চবংশজাত বলে দাবি করতেন| অভিজাত বংশীয় নয় এবং কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বাক্যলাপকে তিনি মর্যাদা হানিকর বলে মনে করতেন| সিংহাসনে মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তিনি দরবারে নানারকম আদব-কায়দা চালু করেন| সুসজ্জিত পোশাক এবং উন্মুক্ত তরবারি হস্তে বিশেষ রাজকীয় বাহিনীর দ্বারা পরিবৃত্ত না হয়ে তিনি কখনও দরবারে বা জনসমক্ষে বের হতেন না| দরবারে গাম্ভীর্য বজায় রাখার জন্য সকল প্রকার চাপল্য ও হাসি-ঠাট্টা, মদ্যপান, নাচ-গান প্রভৃতি নিষিদ্ধ করেন| পারস্য সম্রাটের অনুকরণে সিজদা(সিংহাসনের সামনে নতজানু হওয়া) এবং পাইবস(সম্রাটের পদ যুগল চুম্বন করা) প্রথার প্রবর্তন করেন| এইভাবে বলবন তার চারপাশে এক অস্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি করে প্রমাণ করেন যে, রাজার সকলের ঊর্ধ্বে|

গিয়াসউদ্দিন-বলবনের-কৃতিত্ব-ও-রাজতান্ত্রিক-আদর্শ
সিজদা প্রথা



বলবন কারো সঙ্গেই রাষ্ট্রক্ষমতা ভাগ করে নিতে রাজি ছিলেন না, এমনকি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও নয়| রাজতান্ত্রিক উচ্চ আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথে প্রধান অন্তরায় চল্লিশ চক্রের তুর্কি অভিজাতদের অনেকের জায়গীর তিনি বাজেয়াপ্ত করেন| আবার কয়েকজনকে তিনি বিষ প্রয়োগ করে হত্যাও করেন| এইভাবে ইলতুৎমিশের আমলে গড়ে ওঠা চল্লিশ চক্র ভেঙে যায় এবং সুলতানের স্বেচ্ছাচার প্রতিষ্ঠিত হয়|

বলবনের সিংহাসন আহরণ করার সাথে সাথেই দিল্লির নিকটবর্তী অঞ্চলে মেওয়াটী দস্যুদের ক্রিয়া-কলাপ, দোয়াব অঞ্চল, অযোধ্যা এবং রোহিত খন্ডের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলার ভাঙ্গন দিল্লির সুলতানি অস্তিত্বের সামনে সংকট সৃষ্টি করেছিল| আইন-শৃঙ্খলাকে শক্ত হাতে প্রয়োগ করে এসব অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা বলবনের অন্যতম প্রধান কৃতিত্ব|

পরিশেষে অধ্যাপক হাবিব উল্যাহ বলেছেন যে, বলবনের একটি মাত্র কৃতিত্বই তাকে ইতিহাসে অমর করে রাখার পক্ষে যথেষ্ট, তা হলো রাষ্ট্রকে তার প্রকৃত মর্যাদার সাথে সুপ্রতিষ্ঠিত করা| বিচ্ছিন্নতাবাদী ও শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলিকে সুলতানির বশীভূত করার সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করে বলবন আইবক ও ইলতুৎমিশের অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণতা এনে দেন|




তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ী, "মধ্যকালীন ভারত"
  2. সতীশ চন্দ্র, "মধ্যযুগে ভারত"
  3. Sen, "Ancient Indian History and Civilization".
  4. Charles River Editors, "The Mamluks: The History and Legacy of the Medieval Slave Soldiers Who Established a Dynasty in Egypt".

    সম্পর্কিত বিষয়

    সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                  ......................................................


    Need Help..?

    Ask Questions - (click here)

    Mock Test

    Visit our Mock Test Episodes - (click here)

    Share this post with your friends

    Like and support our Facebook page
    Previous
    Next Post »