শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা

সাহসী যোদ্ধা ও সফল বিজেতা হিসেবে শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা ভারতের ইতিহাসে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন| তার শাসনব্যবস্থা শত্রু-মিত্র সকলের দ্বারা উচ্ছ্বাসিত ভাবে প্রশংসিত হয়েছে| 

মাত্র পাঁচ বছর তিনি দিল্লির সিংহাসনে ছিলেন| এই স্বল্পকালের মধ্যে তিনি এমন এক পরিবর্তন আনেন, তা আকবরের পূর্বেও কোন শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি| তার শাসন ব্যবস্থা প্রাচীন ও আধুনিক ভারতের যোগসূত্র রচনা করেছিল বলা যেতে পারে| 

শেরশাহ স্বৈরাচারী হলেও তিনি ছিলেন প্রজাহিতৈষী| তার শাসন প্রতিভা স্মরণ করে ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ তাকে অষ্টাদশ শতকের জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারী শাসকদের পূর্বসূরী বলে অভিহিত করেছেন|


শেরশাহের-শাসন-ব্যবস্থা




কেন্দ্রীয় সরকার 

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার শীর্ষে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকর্তা ছিলেন স্বয়ং শেরশাহ| কেন্দ্রীয় শাসনের জন্য তিনি মন্ত্রী মন্ডলী রেখেছিলেন| শাসনকার্যে তাকে সাহায্য করার জন্য চারজন মন্ত্রী ছিলেন, এঁরা হলেন-
  1. দেওয়ানে-উজীরাৎ- (অর্থ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী) 
  2. দেওয়ানে-আর্জ (প্রতিরক্ষা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী)
  3. দেওয়ানে-রিসালাৎ (পররাষ্ট্র বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী)
  4. দেওয়ানে-ইনসা (সরকারি দলিল ও চিঠিপত্র বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী)
এছাড়াও ছিল দেওয়ানে কাজি-(প্রধান বিচারপতি) ও দেওয়ানে-বারিদ (গুপ্তচর বিভাগের প্রধান)|



সরকার /পরগনা

শেরশাহ বিকেন্দ্রীকৃত শাসন ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছিলেন| শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য তিনি তাঁর সমগ্র সাম্রাজ্যটিকে 47 টি সরকারে বিভক্ত করে| প্রতিটি সরকারকে আবার কয়েকটি পরগনায় বিভক্ত করে| কয়েকটি গ্রাম নিয়ে পরগনা গঠিত হয়|

প্রত্যেক সরকারের একজন করে শিকদার-ই-শিকদারান ও মুনসেফ-ই-মুনসেফান নামে  দুই উচ্চপদস্থ কর্মচারী থাকতেন| শিকদার-ই-শিকদারান এর দায়িত্ব ছিল আইন-শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা ও বিদ্রোহ দমন করা| মুনসেফ-ই-মুনসেফান এর দায়িত্ব ছিল- দেওয়ানি ও জমি জরিপ সংক্রান্ত মামলার বিচারকার্য সম্পাদন করা|

একইভাবে শেরশাহ পরগনাগুলিতেও শিরদার, মুনসেফ, আমিন, প্রসাবদক্ষ ও করনিক রেখেছিলেন| তিনি কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি দূর করার উদ্দেশ্যে দুই-তিন বছর অন্তর অন্তর বদলির ব্যবস্থা করেন|




শেরশাহের ভূমি রাজস্ব

শাসক হিসেবে শেরশাহের সর্বাপেক্ষা কৃতিত্ব ছিল ভূমি রাজস্ব সরকার| এক্ষেত্রে তিনি সাসারামের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন| তিনি আন্তরিক ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কৃষকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের উপরে দেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল|

তাই তিনি সাম্রাজ্যের সকল জমি জরিপ করে জমির সীমানা নির্ধারণ করেন এবং জমির উৎপাদিকা শক্তি অনুসারে জমিকে ভালো, মাঝারি ও মন্দ- এই তিনটি ভাগে ভাগ করে জমির রাজস্বের পরিমাণ জমির রাজস্বের পরিমাণ স্থির করে| উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ রাজস্ব হিসাবে দিতে হতো এবং তা শস্য বা নগদ অর্থের দ্বারা রাজস্ব প্রদানের সুযোগ কৃষকদের ছিল|

শেরশাহের-শাসন-ব্যবস্থা
কৃষক

শেরশাহের-শাসন-ব্যবস্থা
কৃষি জমি


জমি জরিপ করে শেরশাহ কবুলিয়তপাট্টা নামে দুটি দলিল প্রবর্তন করেন| কৃষককে কবুলিয়ত নামক দলিল সরকারকে দিতে হতো| যাতে সে জমির পরিমাণ উল্লেখ্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা দেওয়ার অঙ্গীকার করতো, বিনিময়ে রাষ্ট্র কৃষকদের স্বত্বকে স্বীকার পাট্টা নামক দলিল দিতো| দুর্ভিক্ষ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় অনুদানের জন্য শেরশাহ বিঘা প্রতি আড়াই সের শস্য আদায় করতেন, খাজনা মুকুব করতেন, এমনকি ঋণও দিতেন|




শুল্ক ও মুদ্রানীতি

ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও অবৈধ শুল্কগুলি তুলে দেন|

শেরশাহের-শাসন-ব্যবস্থা
স্বর্ণ মুদ্রা


তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ ধাতু বিশিষ্ট সোনা-রুপা-তামার মুদ্রা চালু করেন| তিনি রুপি নামে রৌপ্য মুদ্রা ও দাম নামে তাম্র মুদ্রা প্রবর্তন করেন| তিনি তামা ও রুপার খন্ড মুদ্রা চালু করেন, সাথে সাথে সাথে সোনা-রুপা-তামার মুদ্রা বিনিময় হার করে দেন| তিনি স্বর্ণ মুদ্রাও প্রবর্তন করেছিলেন|



যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সরাইখানা

যোগাযোগের জন্য শেরশাহ বহু রাস্তা নির্মাণ করেন| এগুলির মধ্যে বাংলাদেশের সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত- যা বর্তমানে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে পরিচিত| এছাড়া আগ্রা থেকে বুরহানপুর, আগ্রা থেকে যোধপুর এবং লাহোর থেকে মুলতান পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন- এই রাজ্য পথগুলি বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক ছিল|

পর্যটকদের সুবিধার জন্য তিনি পথের ধারে বৃক্ষরোপণ, কূপ খনন ও সরাইখানা নির্মাণ করেন| শেরশাহের সমকালীন ঐতিহাসিক আব্বাস খান শেরওয়ানী-র রচনা থেকে জানা যায় যে, তিনি 1700টি সরাইখানা নির্মাণ করেন এবং সেখানে খাদ্য ও বিশ্রামের ব্যবস্থা ছিল অতুলনীয়/অপ্রশংসনীয়| সরাইখানাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল| বণিকরা এই সরাইখানাগুলিতে মালপত্র বিনিময় করত এবং এগুলিকে কেন্দ্র করে বাজার ও শহর গড়ে উঠেছিল| সরাইখানাগুলি আবার ডাক-চৌকি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো|




বিচার ব্যবস্থার সংস্কার 

নিরপেক্ষ বিচারক হিসাবে শেরশাহের যথেষ্ট সুনাম ছিল| তার সুশাসনে দেশে শান্তি বিরাজ করত| তার বিচার ব্যবস্থা ছিল কঠোর ও পক্ষপাতহীন| বিচারের ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন, ধনী-দরিদ্র তার দন্ড থেকে মুক্তি পেতেন না| আইনের চোখে সকলেই সমান|

প্রত্যেক পরগনাগুলিতে কাজী, মীর আদল, আমিন মুনসেফান আমিন- এদের উপর দায়িত্ব ছিল| শান্তি-শৃঙ্খলা জন্য এই সময় পৃথক কোন পুলিশি সংগঠন ছিল না| শিকদার-ই-শিকদারান ও মুনসেফ-ই-মুনসেফান -এদের উপর নিজ নিজ এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলার দায়িত্ব অর্পিত ছিল| স্থানীয় শান্তি বজায় রাখা ও স্থানীয় অপরাধীদের জন্য তিনি স্থানীয় দায়িত্বের নীতি প্রবর্তন করেন|

ঐতিহাসিক ফিরিস্তা বলেছেন যে, শের শাহের আমলে পুলিশি ব্যবস্থা এতই সুবিন্যাস্ত ও দক্ষ ছিল যে পর্যটক বা বণিকেরা পথের ধারে তাদের মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তেন|


সেনাবাহিনী বা সামরিক ব্যবস্থা 

সামন্ততান্ত্রিক সামরিক বাহিনীর দুর্বলতা উপলব্ধি করে তিনি সরকারের অধীনে একটি স্থায়ী সেনাদল গড়ে তোলেন| এব্যাপারে আলাউদ্দিনের মতো তিনি সেনাবাহিনীতে দাগহুলিয়া প্রথা অপরিবর্তিত রাখে|

শেরশাহের-শাসন-ব্যবস্থা
পদাতিক সেনা

শেরশাহের-শাসন-ব্যবস্থা
অশ্বারোহী সেনা


সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সামরিক ছাউনি ও দুর্গ স্থাপন করে তিনি দেশে নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করেন| পদাতিক, অশ্বারোহী, গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে তার সেনাদল গঠিত হয়| তিনি সেনাদের নগদ অর্থে বেতন দেওয়ার প্রথা চালু করেন|



শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা আকবরকে কতটা প্রভাবিত করেছিল

শেরশাহের প্রশাসনিক ধ্যানধারণা আকবরকে যে প্রেরণা যুগিয়েছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই| শেরশাহের মতো আকবরের প্রশাসনে মূল লক্ষ্য ছিল প্রজা কল্যান| শেরশাহের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, সেনাবাহিনীর গঠন, বিচার ব্যবস্থা, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি আকবরের শাসন নীতিকে প্রভাবিত করেছিল|

ভূমি রাজস্ব ক্ষেত্রে শেরশাহ যে সর্ব নীতি অনুসরণ অনুসরণ করেন, আকবরের ক্ষেত্রেও ভূমির রাজস্বের সেগুলি পরিলক্ষিত হয়| কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি জমি বন্দোবস্ত করার জন্য কবুলিয়তপাট্টা নামক শেরশাহ যে প্রথার প্রচলন করেছিলেন, আকবর তা রাখেন| শেরশাহের মতো উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ আকবর কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করতেন| শেরশাহের বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে সমতা নীতি ও আইনের চোখে সমতার আদর্শের দ্বারা আকবরও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন| সামরিক সংগঠন শেরশাহের "দাগ ও হুলিয়া" প্রথা আকবরের আমলেও পরিলক্ষিত হয়|

অবশ্য শেরশাহের অপেক্ষা আকবরের ধর্মীয় নীতি ছিল অনেক উদার| আকবর সেইরূপ দ্বিধাহীনভাবে হিন্দু-মুসলমানদের সমান অধিকার দিয়েছিলেন, কিন্তু শেরশাহের ক্ষেত্রে এব্যবস্থা সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়| আকবর জিজিয়া কর রদ করেন, শেরশাহ তা পারেননি|

অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠীর মতে, যদিও শেরশাহ ছিলেন সুশাসক ও ন্যায় পরায়ন, তিনি ছিলেন মুখ্যত আফগানদের জাতীয় শাসক| আকবরের মতো মহৎ ও উদার প্রাণ এবং বিরাট সংস্কৃতি চেতনা শেরশাহের মধ্যে ছিল না| শেরশাহ যা কিছু করেন তা প্রয়োজনের জন্য, আকবর যা কিছু করেন তার পশ্চাতে ছিল বিশ্বাস ও প্রেরণা| আকবর সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সমদর্শী নীতির ফলে জাতীয় সম্রাটে পরিণত হন|


মূল্যায়ন 

এসত্ত্বেও বলতে হয় যে, এইভাবে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি এক সুষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন| ঐতিহাসিক স্মিথ বলেন যে, "শেরশাহ আর কিছুকাল জীবিত থাকলে ভারতের ইতিহাসে হয়তো মুঘলদের আবির্ভাব সম্ভব হতো না"|




তথ্যসূত্র

  1. Sen, "Ancient Indian History and Civilization".
  2. Poonam Dalal Dahiya, "Ancient and Medieval India".
  3. সতীশ চন্দ্র, "মধ্যযুগে ভারত"

    সম্পর্কিত বিষয়

    সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                  ......................................................


    নবীনতর পূর্বতন
    👉 Join Our Whatsapp Group- Click here 🙋‍♂️
    
        
      
      
        👉 Join our Facebook Group- Click here 🙋‍♂️
      
    
    
      
    
       
      
      
        👉 Like our Facebook Page- Click here 🙋‍♂️
    
    
        👉 Online Moke Test- Click here 📝📖 
    
    
        
      
               
    
     Join Telegram... Family Members
      
         
                    
                    
    
    
    
    
    
    
    

    টেলিগ্রামে যোগ দিন ... পরিবারের সদস্য

    
    
    
    
    
    
    
    
    
    

    নীচের ভিডিওটি ক্লিক করে জেনে নিন আমাদের ওয়েবসাইটটির ইতিহাস সম্পর্কিত পরিসেবাগুলি

    
    

    পরিক্ষা দেন

    ভিজিট করুন আমাদের মক টেস্ট গুলিতে এবং নিজেকে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুত করুন- Click Here

    আমাদের প্রয়োজনীয় পরিসেবা ?

    Click Here

    ইমেইলের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কিত নতুন আপডেটগুলি পান(please check your Gmail box after subscribe)

    নতুন আপডেট গুলির জন্য নিজের ইমেইলের ঠিকানা লিখুন:

    Delivered by FeedBurner