বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস

আধুনিক ভারত সম্পর্কে রচিত বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে ও গবেষণায় নানাবিধ বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচ্যুতি রক্ষা করা যায়| সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক এই তিনটি উপাদানের উপর ভিত্তি করে ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হয়েছে|

একদিকে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক ব্রিটিশ লেখকগন ভারতবাসীর অনৈক্য, গোঁড়ামি ও কুসংস্কারচ্ছন্ন মনোভাব, ভারতীয় সমাজের অগ্রসরতা প্রভৃতি নেতিবাচক দিকগুলি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন| তাদের ধারণায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার ফলেই ভারত একটি ঐক্যবদ্ধ, আধুনিক ও অগ্রদেশে পরিণত হয়েছে| জাতীয়তাবাদের উগ্র সমর্থক কোন কোন ঐতিহাসিক বিন্দু বিন্দু ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা ও পক্ষপাতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন|

ভারতের-স্বাধীনতা-সংগ্রামের-ইতিহাস
বর্তমানে ভারতের মানচিত্র




অনেকে ভারতের অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক আদর্শের সুফলগুলির প্রতি উদাসীন দেখিয়েছেন| 

অনেকে ভারতের সমন্বয় জাতীয়তাবাদের হিন্দু ধর্ম ভিত্তিক ঐতিহ্যের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়ে কেউ কেউ বহু জাতি, ধর্ম অধ্যুষিত ভারতের সমন্বয় পন্থী জাতীয়তাবাদের দিকটি ঠিক মতো তুলে ধরতে পারেনি| এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, একদিকে মুসলমান সম্প্রদায়কে লেখকগণ সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের সমর্থন করেছেন, অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়কে লেখকগন সাম্প্রদায়িক ভেদ ও বিদ্বেষনীতি প্রচার করে হিন্দু-মুসলমান সংহতিতে ফাটল ধরেয়েছেন|



সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি 

সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আমাদের পার্থক্য অনেক খানি| এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম গড়ে উঠেছে লর্ড ডাফরিন, লর্ড কার্জন ও লর্ড মিন্টোর মতো ভাইসরয় এবং জজ হ্যামিলটনের মতো সেক্রেটারি অ্যাস্টেটের নানা সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে| তা প্রথম অকাট্যভাবে তুলে ধরেছিলেন ভি. চরণ রাওলাট কমিটির রিপোর্টে| ভানি ল্যাভেট ও মন্টেস্কু চেমসফোর্ড তা প্রতিফলিত হয়| একে 1940 সালে প্রথম তত্ত্ব হিসাবে দাঁড় করিয়েছিলেন জনৈক একজন মার্কিন পন্ডিত|

রক্ষণশীল উপনিবেশিক প্রশাসকরা ও কেমব্রিজ সরনা বলে পরিচিত সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারার ইতিহাসবিদরা ভারতের একটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো হিসাবে উপনিবেশিকদের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চান না| তারা উপনিবেশবাদকে দেখেন মূলত বিদেশি, তাই ভারতীয় জনগণের ও ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের স্বার্থের মধ্যে মৌলিক দ্বন্দ্বগুলিকে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের তীব্রতা বৃদ্ধিতে এসব দ্বন্দ্ব যে নিমিত্তের ভূমিকা পালন করেছে, এরা তা মানতে চান না|

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতে সংগ্রামকে তারা দেখেন নকল লড়াই (কৃত্রিম যুদ্ধ), উদ্দেশ্যহীন ও নকল লড়াইতে ব্যাস্ত দুই ছায়ামূর্তির মধ্যে দশেরার দ্বন্দ্ব যুদ্ধ হিসেবে|

ভারত যে একটি জাতি রাষ্ট্র হয়ে উঠার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছিল সাম্রাজ্যবাদী লেখকরা তা মানেন না| তারা মনে করেন, যাকে ভারত বলা হয়ে থাকে তা বাস্তবিক পক্ষে নানা ধর্ম, জাতপাত, জনগোষ্ঠী ও স্বার্থ নিয়ে গঠিত|

ভারতের-স্বাধীনতা-সংগ্রামের-ইতিহাস
ব্রিটিশ পতাকা



তারা মনে করেন হিন্দু-মুসলিম, ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ, আর্য, ভদ্রলোক ও অনুরূপ অন্যান্য অনেক গোষ্ঠী আগে থেকেই রয়েছে| তারা বলেন জাতপাত ও ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠার প্রচলিত প্রথাগত গোষ্ঠীগুলিই রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রকৃতি বুনিয়াদ| জাতপাত ভিত্তি ও ধর্মভিত্তিক  রাজনীতিই মুখ্য জাতীয়তাবাদের নিছক একটি আবরণ মাত্র| ধর্মীয় ব্যাপারটাকে উপস্থিতি করেছেন এভাবে, দূর থেকে দেখলে যেগুলোকে তাদের রাজনৈতিক সংগ্রাম বলে মনে হয়, খুটিয়ে দেখলে দেখা যাবে সেগুলো হামেশাই ওইসব প্রথাগত গোষ্ঠীর নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা বা উন্নত করার প্রয়াস|


সাম্রাজ্যবাদী সরনার লেখকরা

জোর দিয়ে বলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী জনগণের আন্দোলন ছিল না, বরং তা ছিল সমাজের উচ্চকোটি গোষ্ঠীগুলির চাহিদা ও স্বার্থের ফসল|

অধ্যাপক অনিল শীল মনে করেন যে, স্বাধীনতা সংগ্রাম আসলে ইংরেজদের অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য ভারতের উচ্চকোটির গোষ্ঠীগুলির পরস্পরের মধ্যে লড়াই| স্থানীয় মানুষদের এইসব আন্দোলন প্রধানত ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত বলে মনে করা ভুল|

ভারতের-স্বাধীনতা-সংগ্রামের-ইতিহাস
গান্ধীজী


যে ভিত্তির উপর এই উচ্চকোটি গোষ্ঠীগুলো গড়ে উঠেছিল শীল ও তাদের ছাত্ররা সেই ভিত্তিকেই প্রসারিত করেছেন| তারা পরিতৃপ্তির সঙ্গে বলেছেন, পৃষ্ঠপোষক পোষ্য সল্প ভিত্তিতে এসব গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল| ভারতীয় রাজনীতি গড়ে উঠতে শুরু করলে এই পৃষ্ঠপোষক পোষ্য শৃঙ্খলের যোগসূত্রের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে বড় বড় নেতার আবির্ভাব ঘটে| তারা স্থানীয় ক্ষমতাবানদের রাজনীতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের জন্য দালালের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে| শীলের মতে গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল ছিলেন প্রধান রাজনৈতিক দালাল|




জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

ভারতের মুক্তি সংগ্রামের একটি সুপ্রচলিত জাতীয়তাবাদী ইতিহাস তত্ত্বকে এই আলোচনায় স্থান দিতে হয়| খ্যাতনামা ঐতিহাসিকগণ এই ইতিহাস তত্ত্বটিকে পরিপুষ্ট করেছেন, তাদের মধ্যে আছেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, কে. আর নন্দ এবং বিমান বিহারী মজুমদার প্রমুখ|

ভারতের-স্বাধীনতা-সংগ্রামের-ইতিহাস
ব্রিটিশ সৈনিক



এই সকল ঐতিহাসিকগণ ভারতে ইংরেজদের শাসনের নামে বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলেছেন| তারা দেখিয়েছেন যে, এই বিষয়ে প্রেক্ষিতেই জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশ হয়েছিল এবং তা সমগ্র ভারতে পরিব্যপ্ত হয়েছিল| জাতীয়তাবাদ যেমন বিকশিত হয়, তেমনি ভারতের জাতীয় সত্তা স্পষ্ট হতে থাকে| জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের মতে ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ছিল জনগণের সংগ্রাম| তা কোন বিশেষ শ্রেণীর সংকীর্ণ স্বার্থে পরিচালিত হয়নি|

জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণ জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে বিভিন্ন পর্যায় বর্ণবৈষম্যের ও শ্রেণী সংঘাতের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে চাননি|

জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘটনা রূপে বিচার করেন, কিন্তু তাতে বিভিন্ন পর্যায়ে মতবাদের বিরোধী এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে প্রায় সর্বদায় কর্তৃত্ব লাভের জন্য ব্যক্তি গোষ্ঠী দল লড়াই করেছে এবং একে অপরের বিরোধিতা করেছে, এমনকি একে অপরকে আক্রমণ করেছে| এই বিষয়টিকে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকগণ যথাযথ পরিস্থিতিতে উপস্থাপিত করে বিচার করেননি|

মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন ভাবাদর্শ, বিভিন্ন রণনীতি ও রণকৌশল তাদের মূল্যায়নের রচনাবলীতে সম্পূর্ণভাবে উদঘাটিত হয়নি|


সাবলটার্ন দৃষ্টিভঙ্গি

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে নতুন ধারণার গবেষণায় এবং আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন সাবলটার্ন| ঐতিহাসিকগণ তার পূর্ববর্তী সমস্ত ইতিহাস তত্ত্ব বর্জন করেন|  অস্পষ্ট এবং অধিকাংশ ইতিহাস তত্ত্বের প্রচারক ছিলেন রণজিৎ গুহ| 

তাদের মতে, উপনিবেশিক ভারতীয় সমাজে যে কেন্দ্রীয় সংঘাত দেখা যায়, তারা দুই বিরোধী বিন্দুতে অবস্থিত ছিলেন, যথাক্রমে দেশী-বিদেশী শ্রেণী অথবা শিষ্ট বর্গ এবং নিম্নবর্গ অথবা সাবলটার্ন শ্রেণী| অর্থাৎ উপনিবেশিকতা এবং ভারতের মানুষের মধ্যে কেন্দ্রীয় সংঘাত ছিল না| 

তাদের মতে, নিম্নবর্গ প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং শিষ্ট বর্গের আন্দোলন সমূহ ছিল মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত|

ইতালির বিখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক নেতা এন্টনিও গ্রামসি একটি বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে সাবলটার্ন চেতনার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন| রণজিৎ গুহ এবং তার অনুগামী ঐতিহাসিকগণ সেই বিশেষ তত্ত্বই প্রায় নির্বিচারে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণিক সূত্র রূপে গ্রহণ করেছিলেন|

নিম্নবর্গের কথা আলোচনা করতে করতে সাবলটার্ন ঐতিহাসিকগণ ইতিহাসকে দূরে সরিয়ে রেখে নিম্নবর্গের আন্দোলন সমূহের গুনোগান করেছেন এবং উচ্চশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের সমস্ত প্রচেষ্টা, সমস্ত অবদানের নেতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন|



তথ্যসূত্র

  1. সুমিত সরকার, "আধুনিক ভারতের ইতিহাস"
  2. Rajiv Ahir I.P.S, "A Brief History Of Modern India".
  3. Sonali Bansal, "Modern Indian History".

সম্পর্কিত বিষয়

  1. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পটভূমি (আরো পড়ুন)
  2. ক্রিপস মিশন ব্যর্থতার কারণ (আরো পড়ুন)
  3. সম্পদের বহির্গমন তত্ত্ব এবং এটি কিভাবে বাংলার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল  (আরো পড়ুন)
  4. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন  (আরো পড়ুন)
সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Note: Email me for any questions:

    :-Click here:-.

    Your Reaction ?

    Previous
    Next Post »

    আপনার মতামত শেয়ার করুন ConversionConversion EmoticonEmoticon

    Top popular posts