ষোড়শ শতকে জাতিরাষ্ট্র উত্থানের কারণ সমূহ

পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে জাতি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছিল, বিশ্বজনীন সাম্রাজ্য ও বিশ্বজনীন ধর্মের ধারণা ভেঙে পড়েছিল- মধ্যযুগের ইতিহাসে যা এক অভূতপূর্ব ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত| প্রথমে স্পেনে ইসাবেলা ও ফার্দিনান্দ গণদের নেতৃত্বে জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল| পঞ্চদশ শতকের রেনেসাঁস, সংস্কার আন্দোলনভৌগোলিক আবিষ্কার এই জাতিরাষ্ট্র উদ্ভবের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিলেন বলা যায়|

মধ্যযুগের রাজতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে, সামন্ত শাসকেরা রাজার সমস্ত ক্ষমতা গ্রাস করে নেয়| সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার পতন ঘটলে উদীয়মান বুর্জোয়ারা শক্তিশালী রাজতন্ত্র গঠনের স্বপ্ন দেখেন| জনৈক ঐতিহাসিক জানিয়েছেন যে, শহরবাসী বণিকরা, সামন্তরা ও রাজতন্ত্র গঠনের সাহায্য করেছিল| এককথায় বলতে গেলে মুদ্রা নির্ভর অর্থনীতি, শিল্পকর্ম উৎপাদন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরের বিকাশ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার শক্তিশালী রাজতন্ত্রের উত্থানের পটভূমি রচনা করেছিল|

জাতিরাষ্ট্র
নগর
জাতিরাষ্ট্র
বানিজ্য জাহাজ


আলোচ্য সময়ে পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্স ছিল সবচেয়ে বৃহত্তর রাষ্ট্র| তার জনসংখ্যাও ছিল সবচেয়ে বেশি এবং কৃষি উৎপাদনে ফ্রান্স ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় এগিয়ে ছিল| ফ্রান্সের কেলটিক জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে এই জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়েছিল| এই সময় থেকে ফ্রান্স উত্তর-পশ্চিমে ব্রিটানি(Brittany), পশ্চিমে আটলান্টিক এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা করেন| এই নীতি অনুসরণে কার্যকারী ভূমিকা নিয়েছিলেন একাদশ লুই ও অষ্টম চার্লস| বলাবাহুল্য তাদের নেতৃত্বে 1491 সালে ব্রিটানি অন্তর্ভুক্ত হলে ফ্রান্সের জাতিরাষ্ট্র স্পষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে|

তবে ফ্রান্সের জাতিরাষ্ট্রর গঠনের পথে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল| ইউরোপের রিফর্মেশন শুরু হলে ফ্রান্স তখন ধর্মীয় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এবং ধর্মীয় দ্বন্দ্বের সাথে যুক্ত হয় রাজনীতি| স্পেন সেইসময় ফ্রান্সের রাজনৈতিক স্বার্থে হস্তক্ষেপ করেছিল, অস্ট্রিয়া ফ্রান্সকে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গণ্য করতো| ইতালি নিয়ে স্পেনের সঙ্গে ফ্রান্সের দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা চলছিল| এর ফলে ফ্রান্সে জাতি রাষ্ট্র গঠনের কাজ ব্যাহত হয়|

তবে সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে ফ্রান্সের রাজতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে পড়লে জাতিরাষ্ট্র কিছুটা শক্তিশালী রূপ ধারণ করে| রাজারা সেই সময় প্রাদেশিক ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন এবং পরিচালক নামক কর্মচারীর হাতে দেশ শাসনের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়| আইনসভাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়| সম্রাটগণ বেতনভুক্ত সেনাবাহিনী গঠন করেন| স্থায়ী আমলাতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়| রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য কর ব্যবস্থার সংস্কার করা হয়| ভূমিকর, লবণকর স্থাপন করা হয়| ভূমি নির্ভর অভিজাতেরা রাজাকে কর দিতে বাধ্য হন| এর ফলে অভিজাত, এমনকি সাধারণ মানুষ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে| কিন্তু রাজার সেনাবাহিনী তা দমন করে সপ্তদশ শতকে ফ্রান্সে জাতিরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষম হয়|

জাতিরাষ্ট্র
চার্চ


ইংল্যান্ডে টিউডর রাজারা জাতীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন| ইংল্যান্ডে 30 বছরের বেশি সময় ধরে সংগঠিত গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে টিউডররা ক্ষমতা দখল করেছিল এবং ইংল্যান্ডে একটি শক্তিশালী রাজতন্ত্র গঠনে বদ্ধপরিকর হয়েছিল| ইংল্যান্ডের অতি শক্তিশালী ভূস্বামী শ্রেণী ও ক্যাথলিক চার্চ রাজতন্ত্র গঠনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো| রাজা সপ্তম হেনরির আমলে ঐ সকল ভূস্বামী শ্রেণী ও অভিজাতদের দমনের জন্য বিভিন্ন আইন পাস করা হয়েছিল এবং শক্তিশালী স্টার চেম্বার কোর্ট গঠন করে তাদের দমনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল| রাজা সপ্তম হেনরি অভিজাতদের ভূমি অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রের আয় বাড়িয়ে নেন| অভিজাতদের রাজকীয় কর দিতে বাধ্য করেন| এর ফলে ইংল্যান্ড জাতিরাষ্ট্র গঠনের পথে অনেকটা এগিয়ে যায়| এছাড়া ইউরোপের শক্তিশালী রাজপরিবার গুলির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেও তিনি টিউডর রাজবংশকে শক্তিশালী করেছিলেন| এই নীতি অনুসারে তিনি স্পেনের রাজপরিবারের নিচ পুত্রের বিবাহ দেন এবং স্কটল্যান্ডের স্টুয়ার্ট রাজার সঙ্গে কন্যা মার্গারেটের বিবাহ দেন|

তবে অষ্টম হেনরির আমলে(1509-47) ইংল্যান্ডের জাতীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হতে বসেছিল| জাতিরাষ্ট্র গঠনের পথে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ক্যাথলিক চার্চ| হেনরির প্রধান পরামর্শদাতা টমাস ক্রমওয়েল দুটি আইন পাশ করে ইংল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইংল্যান্ডের রাজাকে সার্বভৌম বলে ঘোষণা করেন| 1534 সালে "Act of supremacy" আইন পাশ করে রাজাকে আনুগত্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়| চার্চের উপর পোপের কর্তৃত্বের অবসান হয়| ইংল্যান্ডের রাজাকে চার্চের প্রধান করা হয়|

এইভাবে ইংল্যান্ডে রিফর্মেশনের মধ্য দিয়ে জাতীয়ভাবে উদ্ভব হয়েছিল এবং জাতিরাষ্ট্র গঠনের সহজতর হয়েছিল এবং এর সাথে যুক্ত হয়েছিল জেন্টি শ্রেণীর উদ্যোগ| বলাবাহুল্য ইংল্যান্ডের এই জেন্টি সম্প্রদায়ে আইন ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রাজতন্ত্রের সঙ্গে সহযোগিতা করে ইংল্যান্ডের জাতীয় রাষ্ট্র উত্থানের পথকে উন্মুক্ত করেছিল, যা আজও অব্যাহত|


তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. C. Warren Hollister, "Medieval Europe: A Short History".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .......................................

    Ask questions :

    :

    --Click here:--

    Mock Test

    Visit our Mock Test Episodes - (click here)

    Share this post with your friends

    please like the Facebook Page and support us

    Need help..? send message privately.
    Previous
    Next Post »