উত্তরে রেনেসাঁ এবং দক্ষিণে রেনেসাঁ

ইতালিয়ান রেনেসাঁ বা রেনেসাঁস শুধু দক্ষিণ ইউরোপের সীমাবদ্ধ ছিল না, আল্পস পর্বতমালা পেরিয়ে উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল| ইতালিতে ইউরোপের বণিকরা আসত বাণিজ্য করতে, শিল্পীরা আসত নতুন শৈলী আয়ত্ব করতে, আর ছাত্ররা আসত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষা নিতে`| এদের মাধ্যমে ইতালির রেনেসাঁস ইংল্যান্ড, জার্মানি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও স্পেনে ছড়িয়ে পড়েছিল| এসব দেশের ধর্মশাস্ত্র ভালো করে জানার জন্য প্রাচীন সাহিত্য পাঠ শুরু হয়| 

বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ল্যাটিন ও গ্রিক চর্চার পাশাপাশি ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, সাহিত্য, শিল্প ও বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা হয়েছিল| ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনে স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্য চর্চা শুরু হয়েছিল| উত্তরে রেনেসাঁ প্রাচীন সাহিত্য পাঠের উপর জোর পড়েনি, জোর পড়েছিল ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও ভাষাতত্ত্বের উপর|

উত্তরে-রেনেসাঁ-এবং-দক্ষিণে-রেনেসাঁ
আল্পস পর্বতমালা 

উত্তরে-রেনেসাঁ-এবং-দক্ষিণে-রেনেসাঁ


উত্তরের রেনেসাঁসের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা হলেন ফ্রান্সের লেকেভর দ্য ইটাপলস, বুদে, জার্মানির এগ্রিকোলা, রিউচালিনহাটেন, স্পেনের যাজক জিমিনিস এবং ইংল্যান্ডের গ্রোকিন, কোলেটমুর| উত্তরের শ্রেষ্ঠ রেনেসাঁস পন্থী হলেন পন্ডিত ইরাসমাস|

তবে উত্তরে রেনেসাঁ ইতালি রেনেসাঁসের অন্ধ অনুকরণ মাত্র ছিল না| উত্তরের রেনেসাঁস ছিল একান্তভাবে স্থানীয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ফল| উত্তরের রেনেসাঁসের পূর্ণ বিকশিত ইতালীয় রেনেসাঁসের মত শিল্পচর্চা কোন প্রবণতা তেমন লক্ষ্য করা যায় না| তুলনামূলক বিচারে এই রেনেসাঁস ছিল অনেক বেশি সাহিত্যিক ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ| অবশ্য ইতালির মতো এক্ষেত্রেও মানবতাবাদের সচেষ্ট ভূমিকা ছিল| যদিও এর প্রকৃতি ছিল ভিন্ন| ইতালীয় অর্থাৎ দক্ষিণী রেনেসাঁসের প্রভাবে উত্তরের রেনেসাঁসের সূচনা হলেও এর প্রধান ভিত্তি ছিল বৌদ্ধিক এবং কখনোই শৈল্পিক নয়| এছাড়া ইতালীয় রেনেসাঁসের অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল ধ্রুপদী ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য, কিন্তু উত্তরের রেনেসাঁসের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল খ্রিস্টধর্ম এবং খ্রিস্ট ধর্মীয় সাহিত্য ও দর্শন|

উত্তরে রেনেসাঁসের একজন অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন ইটারপলস| তিনি অ্যারিস্টটলের মধ্যযুগীয় সংস্কার গুলিকে বাতিল করে নতুন করে অ্যারিস্টটলের লেখা গুলির বিশ্লেষণ শুরু করেন| তবে ধর্মীয় প্রভাব থেকে তিনি পুরোপুরি মুক্ত ছিলেন না| এরফলে অ্যারিস্টটলের যুক্তিবাদের চেয়ে কালক্রমে প্লেটোর আদর্শ তাকে আকৃষ্ট করেছিল| তবে ফ্রান্সের তুলনায় ইংল্যান্ড এই নতুন মানবতাবাদী চর্চা অনেকটা এগিয়ে ছিল|

উত্তরে-রেনেসাঁ-এবং-দক্ষিণে-রেনেসাঁ
ইতালি


ষোড়শ শতকের গোড়ায় ইংরেজ মানবতাবাদীদের মধ্যে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন টমাস মুর এবং কোলেট| ইরাসমাসের বন্ধু কোলেট অবশ্য তার জিজ্ঞাসা সীমিত রেখেছিলেন ধর্মীয় ক্ষেত্রে| তিনি নিজেই একজন ধর্মযাজককে ছিলেন| তবুও তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে, বাইবেলে যে খ্রিস্ট ধর্মের পরিচয় আমরা পাই তার সঙ্গে প্রচলিত ধর্ম ব্যবস্থার বিস্তর প্রভেদ ছিল| এই ভাবে ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কারের পটভূমি তৈরি হয়েছিল| কোলেটের তুলনায় মুর অনেক বেশি রক্ষনশীল ছিলেন| তিনি "ইউটোপিয়া" নামে যে বিখ্যাত গ্রন্থটি লেখেন তার প্রতিপাদ্য ছিল যে, শিক্ষিত মানুষের একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্ব পালন করা শিক্ষিত মানুষের কর্তব্য| ইতালীয় মানবতাবাদীদের সঙ্গে এই জাতীয় চিন্তার সাদৃশ্য থাকলেও টমাস মুর ধর্মীয় প্রশ্নে ইরাসমাসের বিরোধিতা করেছিলেন| পরে অবশ্য অষ্টম হেনরির ধর্মসংস্কারের বিরোধিতা করার জন্য তার প্রাণদণ্ড হয়|

উত্তরে রেনেসাঁসের মানবতাবাদীরা মধ্যযুগের শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করে| কোন তত্ত্বের চুলচেরা বিশ্লেষণে তাদের আগ্রহ ছিল না| নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা বিশ্ব ও মানব জীবন জীবনের রহস্য বোঝানোর চেষ্টা করেন| মানবতাবাদীরা বিজ্ঞান শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেননি| কপার্নিকাস পৃথিবীর আবর্তন তত্ত্বের কথা বলেছিলেন| পুরনো পৃথিবী কেন্দ্রিক সৃষ্টি তত্ত্ব তিনি বাতিল করে দেন, কিন্তু তার নতুন চিন্তাধারা তেমন প্রসার লাভ করেনি|

উত্তরের রেনেসাঁ শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেছিল| কবি পিয়ের গাইলস ও জিন সেকেন্ড ধ্রুপদী ধারা অনুসরণ করে কাব্য রচনা করেন| রিউচলিন, কোলেট, মুর ও ইরাসমাস ধ্রুপদী ঐতিহ্য দ্বারা প্রভাবিত হন| এরা যে সাহিত্য রচনা করেন, তা ধর্ম নিরপেক্ষ হলেও ধর্ম বিরোধী ছিল না| একজন সৎ ব্যক্তির পালনীয় নৈতিকতা হল ধর্ম| ইরাসমাস ও হাটেন নতুন শিক্ষার যে রুপরেখা দেন, তাতে মানুষকে জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলার ইচ্ছা ছিল| উত্তরের রেনেসাঁ থেকে সংস্কৃতি নির্ভর শিক্ষার যে আদর্শ গড়ে উঠেছিল তা সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল|

মুরের ইউটোপিয়া উত্তরের রেনেসাঁসের আদর্শের অনেকখানি প্রতিফলন ঘটেছিল| তিনি এমন এক সমাজে কল্পনা করেন, সেখানে থাকবে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সর্বজনীন শিক্ষা, সম্পত্তির উপর সকলে সমানাধিকার এবং বাধ্যতামূলক শ্রম| ধর্মনিরপেক্ষ গৃহী জীবনকে সন্ন্যাস জীবনের উপর বসানো হয়| বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ তাদের চিন্তায় প্রাধান্য পেয়েছিল| ল্যাটিন, গ্রিক, হিব্রু, দর্শন, ধর্মশাস্ত্র, বিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্য পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা হয়েছিল| নতুন শিল্প শৈলীতে বহু আঙ্গিকের মিশ্রণ ঘটেছিল| ধর্মের ক্ষেত্রে বহিষ্করণের পরিবর্তন ঘটলেও ক্যাথলিক আদর্শ অটুট ছিল|

উত্তরের রেনেসাঁসের মধ্যে যুক্তিবাদ প্রাধান্য পেয়েছিল, তবে এই যুক্তিবাদ অবশ্যই ছিল সীমিত| সৃষ্টির নিয়তি, মানুষের অবস্থান ইত্যাদি নিয়ে মৌল প্রশ্ন উঠেনি| দর্শন, রাজনীতি, সমাজ, নৈতিকতা ও পার্থিব জীবনের মধ্যে আলোচনাকে সীমিত রেখেছিলেন| যুক্তিবাদীরা যাদুবিদ্যা ও ডাকিনীবিদ্যা বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করেনি| এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উত্তরের দেশগুলিতে এক ধরনের বৌদ্ধিক উদারনীতিবাদের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল| রেনেসাঁস সমাজ নয় ব্যক্তির প্রতিভাকে স্বীকার করে নিয়েছিল| যুক্তিবাদীরা পার্থিব ও পরলৌকিক ক্ষেত্রে অসাম্যকে অস্বীকার করেছিল| রেনেসাঁসের উদারনীতিবাদ ছিল অভিজাত কেন্দ্রিক, মানুষের অধিকারের কথা এই উদারবাদ ঘোষণা করেনি|


তথ্যসূত্র

  1. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ি, "ইউরোপের ইতিবৃত্ত"
  2. Jacob Burckhardt, "The Civilization of the Renaissance in Italy".
  3. Roberta J. M., "The Biography of the Object in Late Medieval and Renaissance Italy".

সম্পর্কিত বিষয়

সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ| আশাকরি আমাদের এই পোস্টটি আপনার ভালো লাগলো| আপনার যদি এই পোস্টটি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিচে কমেন্টের মাধ্যমে আমাদেরকে জানাতে পারেন এবং অবশ্যই পোস্টটি শেয়ার করে অপরকে জানতে সাহায্য করুন|
                     .....................................

    Note:- Please share your comment for this post :

    :

    --Click here:--

    .

    Share this post with your friends

    please like the FB page and support us

    Previous
    Next Post »

    Top popular posts